দীর্ঘ দুই যুগের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এবং মন্ত্রিসভার ৪৮ সদস্য।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। একই দিনে তাঁর সারথী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আরও ৪৯ জন সদস্য, যাদের মধ্যে ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী।
নির্বাসন থেকে ক্ষমতার শীর্ষে: এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
প্রায় ১৭ বছরের প্রবাস জীবন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই শেষে আজ তারেক রহমানের এই অভিষেক বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় সংগীত ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় শপথের আনুষ্ঠানিকতা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান বলেন, “এই বিজয় আমার নয়, এই বিজয় জুলাই বিপ্লবের শহীদদের এবং গণতন্ত্রকামী কোটি জনতার। আমরা প্রতিহিংসা নয়, বরং ঐক্যের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ।” অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শীর্ষ প্রতিনিধি ও কূটনৈতিক কোরের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মেলবন্ধন: মন্ত্রিসভার বিন্যাস
তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভায় একাধারে যেমন দলের বর্ষীয়ান নেতাদের রাখা হয়েছে, তেমনি তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীদেরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভার ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রীর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভার অর্পণ করা হয়েছে সালাহউদ্দিন আহমদ-এর ওপর।
মন্ত্রিসভায় বিশেষ চমক হিসেবে দেখা গেছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম মুখ নুরুল হক নূর এবং জোনায়েদ সাকি-কে, যারা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান।
নতুন মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্তরা (একনজরে)
| নাম | পদমর্যাদা | মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব |
| তারেক রহমান | প্রধানমন্ত্রী | মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য |
| মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর | মন্ত্রী | স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় |
| আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী | মন্ত্রী | অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় |
| সালাহউদ্দিন আহমদ | মন্ত্রী | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু | মন্ত্রী | বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ |
| ডা. খলিলুর রহমান | মন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) | পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ | মন্ত্রী | মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় |
| জোনায়েদ সাকি | প্রতিমন্ত্রী | শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (সম্ভাব্য) |
| নুরুল হক নূর | প্রতিমন্ত্রী | প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান (সম্ভাব্য) |
চ্যালেঞ্জ ও আগামীর প্রত্যাশা
প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সাংবিধানিক পরিবর্তনের পথে হাঁটাই হবে এই সরকারের প্রধান কাজ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমান যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা বলছেন, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।
উপসংহারে বলা যায়, আজকের এই শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশে যে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার শুরু হলো, তার সাফল্যের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
জনগণের প্রত্যাশা, নতুন সরকার কেবল শাসনের জন্য নয়, বরং সেবার মানসিকতা নিয়ে দেশ পরিচালনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

