ছোট বেলায় আমার এক পোষা ভুত ছিল, আসলে ভুত বন্ধু। ও কিন্তু সবার সামনে আসতো না, কেবল আমিই দেখতে পেতাম ওকে। আবার কখনো সবার সামনে আসলেও কেউ দেখতে পেত না। আমাকে শুধু বলে যেত, কেউ না থাকলে যেন আমি ওর সাথে কথা বলি।। আচ্ছা, ওর নামই তো বলা হয় নাই। ওর নাম হুতুম৷
ইয়া বড় বাড়িতে যখন আমি আর নানি একা থাকতাম, আর বাকি সবাই কাজে বাহিরে যেত তখন আমি একা একা খেলতাম। কখনো ট্রেন ট্রেন, গাড়ি খেলা, পুতুল খেলা, আরও কত কিছু!
একদিন খেলার সময় মনে হল, আমার পেছনে এসে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ফিরতেই দেখলাম কেউ নেই। তারপর কয়েকদিন এমন চললো। আমি যখনই একা একা খেলতাম তখনই মনে হতো কেউ আছে আমার সাথে। কথা বলতে চাইছে। ভয় শুরু হলো আমার। কোথাও গেলে কেউ পিছু পিছু যেতো, আর আমি ভয়ে দৌড় দিতাম। বাসার সামনে ছিল ফুলের বাগান। আরও অনেক গাছ লাগানো।
তারপর ছিল বিশাল মাঠ। খুব গরম পড়লে খালামনির সাথে মাঝে মাঝে যেই ঘরের মেঝেতে ঘুমাতাম, সেই ঘরের দরজা দিয়ে একটা আম গাছ দেখা যেত। একদিন সেই গাছের ফাঁকে আমি কাউকে দেখতে পেলাম। কেউ একজন লাল রং এর একটা ক্যাপ পড়ে ছিল, আর গায়ে ছিল বিভিন্ন রং এর কাজ করা একটা সোয়েটার। খুব অবাক হলাম। এই গরমে কে সোয়েটার পড়ে! ঘুটঘুটে অন্ধকারেও আমি তাকে দেখতে পারছিলাম।কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরের দিন সকালে উঠে আবার যখন আমি সামনের বারান্দায় একা একা খেলছি, তখন পেছন থেকে কেউ ডাকলো। ঘুরে তাকাতেই দেখলাম সেই লাল ক্যাপ আর সোয়েটার পরা কেউ৷
ভয়ে দৌড় দিব তখনই সে বললো, ‘দাঁড়াও দাঁড়াও, ভয় পেয়ো না। আমি তো তোমার সাথে খেলতে এলাম। আমিও একা একা খেলি। একা খেলতে কি ভালো লাগে! তুমিও একা, চলো আমরা একসাথে খেলি। অনেক মজা হবে!’
ভাবলাম বেশ তো, ভালোই হয়। তবুও একটু ভয় করছিল। ওর সাথে কথা বলতে বলতে ভয় কেটে গেলো। কিন্তু বন্ধুর কোনও নাম ছিল না। আমি ওর নাম দিলাম হুতুম বন্ধু। তারপর থেকে আমরা একসাথেই খেলতাম।
হুতুমের সাথে অনেক গল্প করতাম। আমি যখনই একা থাকতাম, হুতুম তখনই চলে আসতো। যখন আব্বু আম্মুকে কাজের জন্য আমাকে একা রেখে যেতে হতো, একা বাসায় খুব ভয় লাগতো। কিন্তু হুতুম চলে আসতো। আবার আমি খুশি হয়ে গল্প করতাম। যখন স্কুলে বন্ধুদের সাথে আড়ি হতো তখন হুতুম এসে বোঝাতো, বন্ধুদের সাথে আড়ি করতে নেই। আমার কষ্ট হলেও ওকে বলতাম।
হুতুম এমন মজার মজার কথা বলতো যে আমার সব কষ্ট চলে যেতো। আস্তে আস্তে যখন বড় হলাম। সবার মাঝে থাকতে হতো, পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত হলাম, হুতুম আমার থেকে একটু একটু করে দূরে চলে যেতে থাকলো। একসময় আর আসতো না। হুতুমকে আর খুঁজে পেতাম না।হুতুম আমাকে শিখিয়েছিল, একা থাকা কষ্টে থাকা সময় গুলি কিভাবে খুশি থাকতে হয়।
এখন আর হুতুম আসে না। আমিও বড় হয়ে গেছি। তবে মাঝে মাঝে হুতুম স্বপ্নে আসে। যখন আমার মন খারাপ থাকে। আমাকে আমার পছন্দের আকাশ, পাহাড়, নীরব রাস্তা ঘুরিয়ে আনে। তারপর আবার চলে যায়। আমার হুতুম বন্ধু! প্রথম খেলার সাথী!
পেপার’স লাইফ/গল্প/নাজিফা তাসনীম জেরিন

