উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাতে কুড়িগ্রামে দুধকুমার, ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র সহ সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত তিনদিন ধরে দুধকুমার, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত থাকায় জেলার নদ-নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করছে।
প্লাবিত হয়ে পড়েছে দুধকুমার, ধরলা,তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিম্নাঞ্চল। বাড়ি ঘরে পানি প্রবেশ করায় অনেকে উঁচু স্থান ও নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদে আরও অন্তত দুই দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থেকে জেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, রবিবার (২৮ জুন) দুপুর তিনটায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে বিপদ সীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অপর দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়ে নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং চিলমারী পয়েন্টে ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও তা এখনও বিপদ সীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার সদর উপজেলার ধরলা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলসহ ধরলা ও ব্রহ্মুপুত্র অববাহিকার হলোখানা, যাত্রাপুর, পাঁচগাছী, ভোগডাঙ্গা ও ঘোগাদহ ইউনিয়ন এবং নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী ও রৌমারী উপজেলার বেশ কিছু ইউনিয়নে পানি প্রবেশ করায় এসব এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

বর্ষার শুরু থেকে ভাঙনে রুদ্র রূপ নেওয়া ব্রহ্মপুত্র নদ অবাহিকার বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। একই সাথে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলায় হাজারো মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছেন।
উলিপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য মতে উপজেলার হাতিয়া, থেতরাই, সাহেবের আলগা ও বেগমগঞ্জ সহ ৮ টি ইউনিয়ন বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার অন্তত ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করছেন। আক্রান্ত মানুষের সহায়তায় ৪৮ মেট্রিকটন চাল ও ছয় লক্ষাধিক টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জেলার সদর উপজেলার ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ৬ টি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দি অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে দিনানিপাত করছেন। যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে তার ইউনিয়নের পোড়ার চর, ঝুনকার চর এবং চর কালির আলগার প্রায় এক হাজারেরও বেশি বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে।
এছাড়াও বন্যার পানিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ওই ইউনিয়নের প্রায় ২১ হাজার মানুষ। সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ময়নুল ইসলাম জানান, উপজেলার বন্যা কবলিত মানুষদের সাহায্যার্থে ৩৬ মেট্রিকটন চাল ও ৩ লাখ ৬ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে যা দুর্গত মানুষদের মাঝে বন্টনের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়াও দুর্গত এলাকার মানুষদের বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। এদিকে, ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে চিলমারী উপজেলার চারটি ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
অষ্টমীচর ও নয়ারহাট ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকার বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে গৃহহারা হয়ে পড়ছেন একের পর এক পরিবার। অন্যদিকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ, ঘড়িয়ালডাঙা ইউনিয়নসহ উলিপুরের থেতরাই ইউনিয়নের কয়েকশ’ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

নয়ারহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হানিফা জানান, তার ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। সাথে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ইউনিয়নের দুইশ’ বিঘার আশ্রয়ন প্রকল্পের কয়েকটি ঘর বিলিন হওয়ার পাশাপাশি হুমকিতে রয়েছে পুরো আশ্রায়ন প্রকল্প সহ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ও দক্ষিণ খাউরিয়া স্কুল এন্ড কলেজ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আগামী আরও দুই দিন ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার এক মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে করে জেলার সদর উপজেলাসহ উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার বেশ কিছু অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
জেলা দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য মতে, বন্যা মোকাবিলায় এ পর্যন্ত ৩শ’ ২ মেট্রিকটন চাল ও ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে যাবতীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
পেপার’স লাইফ/কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি/ চন্দন কুমার সরকার

