সরকার প্রকাশিত নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধির গেজেট গ্রহণ করে নিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর মধ্যে দিয়ে ওই গেজেট নিয়ে সরকারের সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতের দীর্ঘ টানাপড়েন আর তিক্ততার অবসান ঘটল।
অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারকের আপিল বেঞ্চ বুধবার ওই গেজেট গ্রহাণ করে আদেশ দেয়। আদেশে বলা হয়, “সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রিমেসি রেখে সরকার অধঃস্তন আদালতের যে শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধি প্রকাশ করেছে, তা গ্রহণ করেছে আপিল বিভাগ।”
এর আগে গত ১১ ডিসেম্বর সরকার বিচারকদের চাকরিবিধির ওই গেজেট প্রকাশ করে। পরে তা এফিডেভিট আকারে আপিল বিভাগে জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ।
এ বিষয়টির নিষ্পত্তি করে দেওয়া হলেও যার সূত্র ধরে চাকরিবিধির বিষিয়টি আদালতে এসেছিল, সেই মাজদার হোসেন মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণগুলো চলমান রেখেছে আপিল বিভাগ।
আপিল বিভাগে শৃঙ্খলাবিধির এ মামলা প্রথম ওঠে ২০১২ সালের ৩০ মে। সে সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন মো. মোজাম্মল হোসেন। সাত সদস্যের ওই বেঞ্চে তার সঙ্গে ছিলেন বিচারপাতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি মো. শামসুল হুদা।
তাদের মধ্যে বিচারপতি মোজাম্মল হোসেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি মো. শামসুল হুদা অবসরে গেছেন। নানা আলোচনার জন্ম দিয়ে বিচারপাতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে পাঁচজনের বেঞ্চে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি ইমান আলীর সঙ্গে আছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। মোট ৮৪ কার্যদিবস শুনানির পর চাকরিবিধির বিষয়টি নিষ্পত্তির পর্যায়ে এল।
মাসদার হোসেন মামলার চূড়ান্ত শুনানি করে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করতে ঐতিহাসিক এক রায় দেয়। ওই রায়ে আপিল বিভাগ বিসিএস (বিচার) ক্যাডারকে সংবিধান পরিপন্থি ও বাতিল ঘোষণা করে। একইসঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণা করা হয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেয় সর্বোচ্চ আদালত।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে বিচার বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। আইন মন্ত্রণালয় পরে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করে সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়।
সরকারের খসড়াটি ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার অনুরূপ হওয়ায় তা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি বলে ২০১৬ সালের ২৮ আগাস্ট শুনানিতে জানায় আপিল বিভাগ। এরপর ওই খসড়া সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্ট আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেইসঙ্গে তা চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন আকারে আদালতে উপস্থাপন করতে বলা হয় আইন মন্ত্রণালয়কে। আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এর আগে শৃঙ্খলা বিধিমালার যে খসড়া সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হয়েছিল, গতবছর ৩০ জুলাই তা গ্রহণ না করে কয়েকটি শব্দ ও বিধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। শৃঙ্খলাবিধির সেই খসড়া নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মুখে বিচারপতি সিনহা ছুটি নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর দেশ ছাড়ার পর ছুটি শেষে ১০ নভেম্বর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।
