ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি সামরিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আকাশপথে, বাতিল ৪৭৫ ফ্লাইট।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা অনিরাপদ হয়ে পড়ায় শুক্রবার (১৩ মার্চ) ঢাকা থেকে আরও ২৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাতিল হওয়া মোট ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭৫টিতে।
স্থবির আকাশপথ, দিশেহারা হাজারো যাত্রী
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র সদৃশ পরিস্থিতি এখন কেবল গোলাবারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর আঁচ লেগেছে সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও। নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কায় জর্ডান, ইরাক ও লেবাননসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের আকাশপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ বা সীমিত করে দিয়েছে। এর ফলে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটগুলো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য কোনো নিরাপদ রুট খুঁজে পাচ্ছে না।
শুক্রবার সকাল থেকেই বিমানবন্দরের টার্মিনালে ভিড় করেছেন হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক ও বিদেশগামী যাত্রী। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ পর্যায়ে, কেউবা কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার শেষ সময়সীমায় দাঁড়িয়ে আছেন। বৃহস্পতিবার ২৮টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর আজকের এই নতুন বিপর্যয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। এয়ারলাইন্সগুলোর কাউন্টারের সামনে অসহায় যাত্রীদের দীর্ঘ সারিই বলে দিচ্ছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা।
বড় অংকের লোকসানের মুখে এয়ারলাইন্স খাত
ফ্লাইট বাতিলের এই মিছিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইতিহাদ এয়ারওয়েজ। বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে গিয়ে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ, যা অনেক এয়ারলাইন্সের জন্য বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, “এটি কেবল যান্ত্রিক কোনো ত্রুটি নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের ফলাফল। আমাদের হাতের বাইরে থাকা এই পরিস্থিতির কারণে শিডিউল তছনছ হয়ে গেছে।” তিনি আরও জানান যে, রুট পরিবর্তন করে ফ্লাইট পরিচালনা করতে গেলেও অনেক দেশের কাছ থেকে নতুন করে ‘ওভারফ্লাইং পারমিশন’ পেতে সময় লাগছে।
একনজরে আকাশপথের বর্তমান চিত্র
আজকের বাতিল ফ্লাইট: ২৫টি (শুক্রবার, ১৩ মার্চ)।
গতকালের চিত্র: ২৮টি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছিল।
মোট পরিসংখ্যান: গত ১৪ দিনে ঢাকা থেকে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭৫টিতে।
প্রধান আক্রান্ত গন্তব্য: জেদ্দা, রিয়াদ, দুবাই, দোহা এবং কুয়েত সিটি।
বর্তমান অবস্থা: শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের শিডিউল পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম।
প্রবাসী শ্রমিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ছুটিতে দেশে আসা অনেক শ্রমিকের সৌদি আরব বা দুবাই ফেরার টিকিট ছিল এই কয়েক দিনে। ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ফলে তাদের কর্মস্থলে যোগদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেকের আশঙ্কা, সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে নিয়োগকর্তারা তাদের চাকরি বাতিল করতে পারেন।
বেবিচক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিস্থিতি সামান্য অনুকূলে এলেই আটকে পড়া যাত্রীদের জন্য বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে আকাশসীমা কবে নাগাদ পুরোপুরি নিরাপদ হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

