মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বাড়ছেই, আক্রান্ত ১৩১ শহর


মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা বাড়ছেই, আক্রান্ত ১৩১ শহর

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ংকরী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ইরান জুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির ১৩১টি শহরে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে, যা বর্তমান দশকের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে ইরান: রেড ক্রিসেন্টের উদ্বেগ

সোমবার সকালে তেহরান থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩১টি শহর এই যৌথ অভিযানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রতি মুহূর্তেই বাড়ছে। ৫৫০ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হলেও উদ্ধার অভিযান চলার সাথে সাথে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আবাসিক এলাকা এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ এই হামলাকে “নজিরবিহীন আগ্রাসন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করেই এই সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

নজিরবিহীন উদ্ধার অভিযান ও মানবিক তৎপরতা

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানজুড়ে এক বিশাল মানবিক মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট। সংস্থাটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে বিরতিহীন কাজ করে যাচ্ছে। আকাশপথে হামলার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ১ লাখেরও বেশি প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এখন রণক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতেও পূর্ণ সতর্কাবস্থায় কাজ করছেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ইরানজুড়ে প্রায় ৪০ লাখ স্বেচ্ছাসেবকের একটি নেটওয়ার্ক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই বিশাল বাহিনী কেবল খাদ্য বা ওষুধ সরবরাহই নয়, বরং আহত ও স্বজনহারা পরিবারগুলোকে মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন (Psychological Support) দেওয়ার জন্যও কাজ করছে। যুদ্ধের বিভীষিকায় আতঙ্কিত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে এটি এখন পর্যন্ত ইরানের ইতিহাসে বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ।


এক নজরে হামলার ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র:

  • মোট আক্রান্ত শহর: ১৩১টি (পুরো ইরান জুড়ে বিস্তৃত)।

  • প্রাণহানি: ৫৫০ জনের বেশি (সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী)।

  • উদ্ধারকর্মী: ১ লাখের বেশি কর্মী মাঠপর্যায়ে মোতায়েন।

  • স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক: ৪০ লাখ মানুষ মানবিক সেবায় প্রস্তুত।

  • মানবিক সংকট: চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।


ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আগামীর শঙ্কা

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যেতে পারে। ইরানের ১৩১টি শহরে একযোগে হামলা চালানোর অর্থ হলো দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত হানা। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বা তার সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো যদি পাল্টা আঘাত করে, তবে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে বলে অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন।

ইতিমধ্যেই তেহরানের পক্ষ থেকে “কঠোর প্রতিশোধের” হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও মাঠের পরিস্থিতি এখনো থমথমে। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, যদি অবিলম্বে হামলা বন্ধ না হয়, তবে এই ১৩১টি শহরের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উত্তরণে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

ইরানের ওপর এই যৌথ হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে মানবিক সুরক্ষা পর্যন্ত সবকিছুকে হুমকির মুখে ফেলেছে।