যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে ইরানের ‘পাল্টা ৫ শর্ত’



চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটনের ১৫ দফা প্রস্তাবের জবাবে এবার পাল্টা পাঁচ দফা কঠোর শর্ত ছুঁড়ে দিয়েছে তেহরান।

গত সোমবার হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরোক্ষ আলোচনার আহ্বানে সাড়া দিলেও নিজেদের অবস্থানে অনড় ইরান।

এই শর্তগুলো পূরণ না হলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি অধরাই থেকে যাবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে দেশটি।


সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও তেহরানের শক্ত অবস্থান

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া এই ছায়াযুদ্ধ এখন এক জটিল মোড় নিয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত শান্তি পরিকল্পনার বিপরীতে ইরান যে দাবিগুলো উত্থাপন করেছে, তা ওয়াশিংটনের জন্য হজম করা বেশ কঠিন হতে পারে। ইরানি প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা চায় তেহরান।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই শর্তগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের মূলে আঘাত করতে চাইছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে তেহরানের এই ‘কাউন্টার অ্যাটাক’ ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে।

ইরানের ৫ দফা: কী চাইছে তেহরান?

যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে ইরান যে দাবিগুলো পেশ করেছে, তার প্রতিটিই ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শর্তগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • স্থায়ী শান্তির গ্যারান্টি: ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যেন পুনরায় কোনো অজুহাতে যুদ্ধ শুরু করতে না পারে, তার জন্য একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ও আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে।

  • মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার: পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ইরান মনে করে, এই ঘাঁটিগুলোই অঞ্চলের অস্থিরতার মূল কারণ।

  • ক্ষতিপূরণ দাবি: যুদ্ধের ফলে ইরানের অবকাঠামো ও অর্থনীতির যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

  • হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর নতুন একটি আইনি কাঠামো কার্যকর করতে হবে, যার মাধ্যমে এই এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে।

  • বিদ্বেষপূর্ণ সংবাদমাধ্যমের বিচার: ইরানের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংবাদমাধ্যম কর্মীদের হয় তেহরানের হাতে তুলে দিতে হবে, নতুবা কঠোর বিচারের আওতায় আনতে হবে।

একনজরে সংকটের মূলবিন্দু

“ইরানের এই শর্তগুলো কেবল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন প্রভাব হটিয়ে দেওয়ার একটি কৌশলগত ব্লু-প্রিন্ট। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ঘাঁটি প্রত্যাহারের দাবিটি ওয়াশিংটনের জন্য রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমা হতে পারে।” — মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

ইরানের এই শর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপের দাবি। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে যাওয়ার অর্থ হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চাবিকাঠি তেহরানের কাছে থাকা। অন্যদিকে, গণমাধ্যম কর্মীদের হস্তান্তরের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

ট্রাম্পের ১৫ দফা বনাম ইরানের ৫ দফা—এই দুই মেরুর অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া এখন খাদের কিনারায়। একদিকে ওয়াশিংটন চাইছে ইরানের পারমাণবিক স্বপ্ন ধূলিসাৎ করতে, অন্যদিকে তেহরান চাইছে নিজেদের আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রেখে মার্কিনদের বিতাড়িত করতে।