রাষ্ট্র পরিচালনা শেষে আপন আঙিনায় ড. ইউনূসের আবেগঘন প্রত্যাবর্তন


রাষ্ট্র পরিচালনা শেষে আপন আঙিনায় ড. ইউনূসের আবেগঘন প্রত্যাবর্তন

দেড় বছরের এক ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর শেষে নিজের চেনা ভুবনে ফিরলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের এক বিশেষ ক্রান্তিকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ড. ইউনূস।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক চার দিন পর, আজ রোববার তিনি মিরপুরের গ্রামীণ টেলিকম ভবনে নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন।

ফুলের শুভেচ্ছা ও পুরোনো সহকর্মীদের মিলনমেলা

আজ সকালে যখন অধ্যাপক ইউনূস মিরপুরের গ্রামীণ টেলিকম ভবনে পৌঁছান, তখন সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ ১৮ মাস পর প্রিয় অভিভাবককে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন ইউনূস সেন্টারের কর্মীরা। গেট থেকে শুরু করে তার অফিস কক্ষ পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাকে ফুলেল অভ্যর্থনা জানানো হয়।

সহকর্মীদের এই ভালোবাসায় সিক্ত ড. ইউনূসকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছিল। তবে তার চোখেমুখে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি—একটি বিশাল দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার তৃপ্তি। তিনি একে একে সবার সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর ডেস্কে বসে পুরোনো ফাইলের ওপর চোখ বোলান। ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

২০২৪ সালের আগস্টের এক উত্তাল সময়ে যখন দেশের প্রশাসনিক কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছিল, তখন ছাত্র-জনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার দেড় বছরের শাসনামল ছিল নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জিং। একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, অন্যদিকে ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনর্গঠন—এই দুইয়ের মাঝে সমন্বয় করতে হয়েছে তাকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া। নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে তিনি গণতান্ত্রিক ধারার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আজ গ্রামীণ টেলিকম ভবনে ফেরার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন যে, ক্ষমতার মোহের চেয়ে নিজের আদর্শিক কর্মক্ষেত্রই তার কাছে অধিকতর প্রিয়।


ইউনূস সেন্টারের আগামীর কর্মপরিকল্পনা

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব শেষে এখন ড. ইউনূস পুনরায় তার ‘থ্রি জিরো’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নেট কার্বন নিঃসরণ) লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করবেন বলে জানা গেছে। আজ অফিসে ফেরার পর তার কাজের প্রধান কয়েকটি দিক ছিল:

  • সামাজিক ব্যবসা: বিশ্বজুড়ে সামাজিক ব্যবসার প্রসারে নতুন কোনো মডেল নিয়ে আলোচনার সূচনা।

  • আন্তর্জাতিক যোগাযোগ: দেড় বছর রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় অনেক আন্তর্জাতিক সেমিনারে তিনি সশরীরে অংশ নিতে পারেননি; এখন থেকে সেগুলোর সাথে পুনরায় যুক্ত হওয়া।

  • ক্ষুদ্রঋণ ও উদ্ভাবন: গ্রামীণ ব্যাংক মডেলের বৈশ্বিক আপডেট এবং নতুন উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলোর পর্যালোচনা।

  • তরুণদের ক্ষমতায়ন: বিশ্বজুড়ে তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার যে দর্শন তিনি প্রচার করেন, তার গতি বাড়ানো।


অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির অফিসে ফিরে আসা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। সাধারণত দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে মানুষ সেই গদি ছাড়তে চায় না। কিন্তু ড. ইউনূস দেখালেন, দায়িত্ব শেষ হলে একজন পেশাদার মানুষ কীভাবে সাবলীলভাবে নিজের পুরোনো ঠিকানায় ফিরে যেতে পারেন।

মিরপুরের এই ভবনটিই এখন আবার বিশ্বখ্যাত এই ব্যক্তিত্বের প্রধান বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল আর কঠোর নিরাপত্তা বলয় থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এখন আবার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনের কারিগর হিসেবে কাজ করবেন। দেশের মানুষ তাকে যে সম্মান আর ভালোবাসা দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পাঠিয়েছিল, আজ তার সগৌরবে ফিরে আসা সেই আস্থারই প্রতিফলন।