এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন পটপরিবর্তনের সাক্ষী হলো মধ্যপ্রাচ্য। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তেহরানে নিজ কার্যালয়ে এক ভয়াবহ হামলায় নিহত হয়েছেন।
আজ রবিবার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি এই খবর নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ নেতা ‘শাহাদাত বরণ’ করেছেন। এই ঘটনায় ইরানজুড়ে ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
রক্তাক্ত শনিবার: যা ঘটেছিল তেহরানে
শনিবার সকালটা ইরানের জন্য আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো ছিল না। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত প্রশাসনিক এলাকায় খামেনির নিজস্ব কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। যদিও হামলার ধরন নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে, তবে এর ভয়াবহতা ছিল সুদূরপ্রসারী। কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের মাটিতে এটিই সবচেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
আজ সকালে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি-র পর্দায় কালো ব্যানার প্রদর্শন করে এই দুঃসংবাদটি প্রচার করা হয়। ভাষ্যকার অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “ইসলামী বিপ্লবের পথপ্রদর্শক আর আমাদের মাঝে নেই।” এই ঘোষণার পরপরই তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে নেমে আসে স্তব্ধতা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ও বিশ্ব রাজনীতির উত্তাপ
ইরানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই আন্তর্জাতিক মহলে এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন। অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ট্রাম্প লেখেন, “খামেনি, যিনি ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের একজন ছিলেন, তিনি মারা গেছেন।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এবং খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ঝড়ের সংকেত দিচ্ছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক এখন কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি:
নিহতের সময়: শনিবার সকালে তেহরানে নিজ কার্যালয়ে হামলার শিকার হন তিনি।
শোক ঘোষণা: আজ ১ মার্চ থেকে ইরানে পরবর্তী ৪০ দিনের জন্য রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা: তেহরানের আকাশসীমা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পরবর্তী নেতৃত্ব: আয়াতুল্লাহ খামেনির স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে নানা জল্পনা চলছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কেবল ইরানের একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশটির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮৯ সাল থেকে টানা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশটির নীতি নির্ধারণ করে এসেছেন। তার প্রয়াণে ইরানি শাসনব্যবস্থায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
বিবিসি ও সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দেশটির পরবর্তী ‘সুপ্রিম লিডার’ নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং এই মুহূর্তে সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তরসূরি তৈরি নেই। দেশটির ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এখন কার হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, সেটাই দেখার বিষয়।
কোন পথে ইরান?
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিতে পারে। একদিকে দেশের ভেতরে শোকাতুর জনতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইরান এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সামনে। এই হামলা কি কোনো বড় যুদ্ধের দামামা, নাকি ইরানের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের নতুন পথ— তা সময়ই বলে দেবে।

