শুরুতেই অনিয়ম ড্রাইভিং লাইসেন্সে


paperslife

গত বছরের জুলাইয়ে সারা দেশ উত্তাল হয়েছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে। এ বছরও বাসচাপায় সহপাঠীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা অন্যান্য দাবির পাশাপাশি ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা মিলেছে দেশী-বিদেশী গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিবেদনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘গ্লোবাল স্ট্যাটাস অন রোড সেফটি ২০১৮’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চালকদের মাদকাসক্তির কথা উঠে এসেছে। অন্যদিকে মানবিক সাহায্য সংস্থা (এমএসএস) নামের একটি এনজিওর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস, মিনিবাস, ট্রাক ও লরিচালকদের ৭০ শতাংশই দৃষ্টি সমস্যায় ভুগছেন।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে আগে লার্নার লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়। লার্নার লাইসেন্সের আবেদনপত্রের সঙ্গে চিকিৎসকের প্রত্যয়নসহ একটি মেডিকেল সনদ জমা দিতে হয়। দৃষ্টি সমস্যা, বর্ণান্ধ, রাতকানা, বধিরতা, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা উঠে আসার কথা এই মেডিকেল সনদে।

অভিযোগ রয়েছে, লার্নার লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীদের বেশীরভাগই ভুয়া মেডিকেল সনদ জমা দেন। বিআরটিএর (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা ও অসাধুতার কারণে ভুয়া মেডিকেল সনদ দিয়েই ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছেন অনেকে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রথম ধাপে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স পাওয়ার আবেদন করতে হয় একজন প্রার্থীকে। দুই পৃষ্ঠার ফর্মের এক পাশে প্রার্থীর তথ্য, অন্য পাশে থাকে মেডিকেল সার্টিফিকেট। প্রথম পৃষ্ঠাটি প্রার্থী নিজেই পূরণ করেন। দ্বিতীয় পৃষ্ঠাটি টাকার বিনিময়ে পূরণ করিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ প্রার্থীর চোখ, কান, অঙ্গহানি ও মাদকাসক্তি নেই মর্মে একজন চিকিৎসক প্রত্যয়ন করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স করাতে মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর বিআরটিএতে এসেছিলেন । গত দুই বছর তিনি মোহাম্মদপুর-গুলশান রুটে লেগুনা চালাতেন। স্ট্যান্ডে টাকা দিয়ে চালাতেন। রাজধানীর অধিকাংশ রুটে লেগুনা চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি। এখন রাইড শেয়ারিংয়ে গাড়ি চালাতে চান বলে ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করতে বিআরটিএতে এসেছিলেন তিনি। মিনিট দশেকের মধ্যেই ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে লার্নার লাইসেন্স হাতে পেয়ে যান।

কীভাবে এত অল্প সময়ে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স পেলেন জানতে চাইলে তিনিবলেন, ব্যাংকে জমার টাকা ছাড়া বিআরটিএর দালালের সঙ্গে ১ হাজার টাকার চুক্তি ছিল লার্নার করিয়ে দেয়ার জন্য। এর মধ্যে ৩০০ টাকা খরচ করে ওই দালাল তাকে একটি মেডিকেল সনদ তৈরি করে দিয়েছেন। এভাবেই তিনি লার্নার পেয়ে গেছেন।

দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় বিআরটিএর ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখায় দাঁড়িয়ে কেবল একজনের হাতে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল রিপোর্ট দেখা যায়। কিন্তু সবকিছু ঠিক থাকলেও জুবায়ের নামের ওই প্রার্থীর রিপোর্টটি গ্রহণ করেনি বিআরটিএর ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখা। পরে তিনিও একই পথ ধরে দালালদের মাধ্যমে ৫০০ টাকার বিনিময়ে মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন।

ভুয়া মেডিকেল সনদের দায়ভার বিআরটিএর ওপরই চাপাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক বলেন, মেডিকেল সনদে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রত্যয়ন থাকতে হয়। যেকোনো ধরনের প্রত্যয়নে ভুয়া সিল-স্বাক্ষর দেয়ার প্রবণতা শুধু বিআরটিএ নয়, সবখানেই আছে। কিন্তু ঘটনাটি যখন চালকদের শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে।

কারণ ভুয়া মেডিকেল সনদ নিয়ে যদি শারীরিকভাবে অক্ষম কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে যায়, তাহলে তার দ্বারা যেকোনো সময় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই ভুয়া মেডিকেল সনদটি বিআরটিএ ঠিকমতো যাচাই করতে পারছে না।

বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার সময় মেডিকেল সনদের বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন। সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন) মাহবুব-ই-রব্বানী অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ভুয়া সনদের অভিযোগ সঠিক নয়। আমরা এ ব্যাপারে সবসময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি।তবুও আমরা মেডিকেল সনদে দেয়া তথ্যগুলো আরো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করব।