দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারার নতুন সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে। এই যাত্রায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান অগ্রাধিকার—এমনটিই জানিয়েছেন নবনিযুক্ত তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে আর ‘ভয়মুক্ত’ সাংবাদিকতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।
সচিবালয়ে প্রথম দিন ও নীতিগত অবস্থান
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণের পর আজ বুধবার বেলা সোয়া একটার দিকে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আসেন জহির উদ্দিন স্বপন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এরপরই তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এবং নিজের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও দর্শনের কথা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, “গণমাধ্যম হচ্ছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। গত দেড় দশকে সাংবাদিকরা যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তার অবসান ঘটানোই আমাদের প্রথম কাজ। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে সত্য বলার জন্য কোনো সাংবাদিককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অন্য কোনো কালাকানুনের ভয়ে কুঁকড়ে থাকতে হবে না।” তিনি বিশ্বাস করেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে।
কালাকানুন বাতিল ও সংস্কারের ইঙ্গিত
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে জহির উদ্দিন স্বপন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে গণমাধ্যমের সংকটগুলো তার নখদর্পণে। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকারের করা বিতর্কিত আইনগুলো পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে যে ধারাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায়, সেগুলো বাতিলের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তার মতে, সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়। বরং গঠনমূলক সমালোচনা সরকারকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, নতুন সরকারের আমলে কোনো সাংবাদিক হয়রানিমূলক মামলার শিকার হবেন না। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকরা যাতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পান, সেটি নিশ্চিত করতে তিনি বদ্ধপরিকর।
চ্যালেঞ্জ ও আগামীর প্রত্যাশা
একজন ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে জহির উদ্দিন স্বপন জানেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। বিশেষ করে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে সাংবাদিকবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নবগঠিত মন্ত্রিসভায় তার মতো একজন মিডিয়া-সচেতন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি সাধারণ সাংবাদিকদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে তারা এর কার্যকর প্রয়োগ দেখতে চায়।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি নতুন সরকার আসলেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। জহির উদ্দিন স্বপনের হাত ধরে তথ্য মন্ত্রণালয় কেবল সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে নয়, বরং জনগণের তথ্যের অধিকার রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে আবির্ভূত হবে—এমনটিই প্রত্যাশা সবার।
সচিবালয়ের প্রথম দিনের এই ব্রিফিংয়ে জহির উদ্দিন স্বপন যে ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা দেশের ভঙ্গুর সংবাদ শিল্পের জন্য একটি বড় সঞ্জীবনী হতে পারে। তিনি তার বক্তব্যে এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো:
ভয়মুক্ত পরিবেশ: সাংবাদিকরা নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রকাশ করতে পারবেন।
আইনি সংস্কার: গণমাধ্যমবিরোধী বিতর্কিত আইনগুলো সংশোধন বা বাতিলের উদ্যোগ।
মুক্ত তথ্যপ্রবাহ: সরকারি তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে স্বচ্ছ প্রশাসন গঠন।
পেশাদারিত্বের মর্যাদা: সাংবাদিকদের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান।

