সাকিব আহমেদের গল্প “এবং মাশরাফি”



সাকিব আহমেদ

বাড়ি থেকে বেরিয়ে থমকে যেতে হলো। রাস্তাগুলো যেন অন্যরকম লাগছে। চারিদিকে পোস্টের, ব্যানারে ছড়াছড়ি। না, কোনো নির্বাচনী প্রচারনা না। একজনকে সম্মান প্রদর্শনের জন্যই এই আয়োজন। ভক্ত-সমর্থক যে যেভাবে পেরেছে তার সম্মানে নিজের সবটুকু চেষ্টা করেছে।
আজ মাশরাফির শেষ খেলা। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বদলে দেওয়া এক নায়ক। অনেকের আদর্শ, অনেকেরই অনুপ্রেরণা। যার নামেই বাংলাদেশ ক্রিকেট সজ্ঞায়িত হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেটের অপর পিঠেই থাকে সে। এমন এক মহানায়ক আজ বিদায় জানাচ্ছে ক্রিকেটকে। লাল-সবুজের জার্সিটি তুলে রাখার সময় হয়েছে তাঁর। তাঁরই সম্মানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও বাংলাদেশের সরকার তাঁকে গার্ড অব অনার দিবে। শুধু তারাই নয়, এদেশের প্রতিটি মানুষ যে যেভাবে পেরেছে তাঁকে সম্মান জানাতে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

আমার কাছে? মাশরাফি একটি অনুপ্রেরণা। আমার কাছে মাশরাফি ভালো লাগা ও ভালবাসা। নিজের প্রিয় খেলোয়াড়ের এই বিদায় বেলায় মাঠে বসে না দেখতে পারলে আফসোসের সীমা থাকবে না। অনেক যুদ্ধের পর সোনার হরিণ, এই ম্যাচের টিকিট হাতে পেলাম। তাই আমার মত সুখী হয়ত আর কেউ নয়। তারপরও প্রিয় খেলোয়াড়ের বিদায় যে মন খারাপ করে দেয়।

স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। গুলিস্তান থেকে মিরপুরের বাসে উঠলাম। গন্তব্য হোম অব ক্রিকেট, মিরপুর। পুরো ঢাকা যেন মাশরাফিতে রঙিন। মাশরাফির পোস্টারে ছেয়ে আছে ঢাকার রাস্তা, বোধহয় পুরো দেশও।
অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে এসেছে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে। সিরিজ শুরুর আগে হঠাৎ করে মাশরাফির অবসরের ঘোষণা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই সাথে ছেড়ে দিয়েছেন নিজের অধিনায়কের দায়িত্বও। যেই দলকে এত কিছু দিয়েছেন, শেষ সিরিজে সেই দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না বলেই এমন সিদ্ধান্ত। তাই বিসিবির সিদ্ধান্তে, মাহমুদুল্লাহর নেতৃত্বেই ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন ম্যাশ।

মাশরাফির হাতে করে তৈরি দল তাঁর বিদায়ী সিরিজে দুর্দান্ত, অদম্য। মাশরাফিকে সিরিজ উপহার দিতে তারা যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। চার ম্যাচ শেষে সিরিজ সমানে সমান। আজ যেই দল জিতবে তার ভাগ্যেই উঠবে সিরিজ।
ভাবনায় ছেদ পড়ল কন্ডাক্টরের ডাকে। বাস এসে গেছে মিরপুর। বাস থেকে নামলাম। মিরপুরের এই স্টেডিয়াম চত্তর যেন আরো রঙিন। যেখানে চোখ যায় কেবল মাশরাফি আর মাশরাফি।

স্টেডিয়ামে ঢুকলাম। ভালো মত একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসে পড়লাম। এখান থেকে ভালো ভাবে খেলা দেখা যাবে। একটু পরেই টস। টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করবে অস্ট্রেলিয়া। মাহমুদুল্লাহ স্পষ্ট বলল, আজ তারা ম্যাশের জন্যই খেলবে।

ব্যাটিংয়ে নামল তামিম ইকবাল ও তরুণ পিনাক ঘোষ। দেখে শুনে শুরু দুই ওপেনারের। কিন্তু মিচেল স্টার্ককে সামলানোর সাধ্য ছিল না পিনাকের। বোল্ড আউট হয়ে ফিরে যেতে হলো তাকে। এরপর নামা আরেক তরুণ নাজমুল হোসেন শান্তও আউট হেজেলেউডের বলে অধিনায়ক স্মিথকে ক্যাচ দিয়ে। স্কোর বোর্ডে তখন ১৫ রানে দুই উইকেট।

তখন ক্রিজে নামে মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিকুর রহিম। তামিমের সাথে ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টায় ধৈর্য্যের পরীক্ষা তার। দুইজনের ধীরস্থির ব্যাটিং। কিন্তু তামিম যখন ব্যর্থ হয়ে ২২ রানে ফিরে যাচ্ছে স্কোর বোর্ডে তখন ৩৫ রানে তিনটি উইকেট নেই।

পুরো গ্যালারি স্তব্ধ। কোথায় কোনো শব্দ নেই। তবে কি মাশরাফির বিদায়ী ম্যাচে এভাবে হারতে হবে? সে কি করে হয়? মাঠে নামছে সাকিব আল হাসান। ড্রেসিং রুম থেকে বের হয়ে একবার গ্যালারির দিকে চেয়ে দেখল। কি ভাবলো কে জানে? মাথা ঝাকিয়ে ক্রিজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সেখানে অপেক্ষা করছে মুশফিক।

সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম! আমাদের আশা, আমাদের ভরসা। কতবার কতভাবে যে এই দুইজন বাঁচিয়েছে তার হিসেব মেলা ভার। আরো একবার তাদের দিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ। এবারো তারা হতাশ করেনি। কখনো সাকিব, কখনো মুশফিক। তাদের ব্যাটে দিশেহারা অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা। তাদের ১৮৬ রানের জুটি ততক্ষণে ম্যাচ বাঁচিয়েছে।

প্রথমে মুশফিক, পরে সাকিব আউট হলেও শেষ দিকে অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ ও মোসাদ্দেকের ব্যাটে ২৮৮ করে বাংলাদেশ। মাশরাফিকে শেষ ম্যাচে জয় উপহার দিতে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৮ রানের আগে থামাতে হবে বোলারদেরই।

নামছে অস্ট্রেলিয়ার দুই ব্যাটার এ্যারন ফিঞ্চ ও ডেভিড ওয়ার্নার। নতুন বলে নিয়মিতভাবে মুস্তাফিজ শুরু করলেও, মাহমুদুল্লাহ আজ মাশরাফির হাতেই বল তুলে দিল। প্রথম বলেই চিরচেনা মাশরাফি। বোলিং মার্ক থেকে দৌড় শুরু করল ম্যাশ। হাত থেকে বল ছাড়ার পর পিচে পড়ে বল যেই সুইং করল তা বোঝার সাধ্য ছিল না ডেভিড ওয়ার্নারের। পরের বলেও ঠিক একই পরিস্থিতি। তৃতীয় বলে কোনো মতে বলে ব্যাট ছুঁয়েই এক রান নিয়ে যেন হাপ ছেড়ে বাঁচল। পরের বলেই প্রথম আঘাত। মাশরাফির সুইংয়ে পরাস্ত হয়ে বল সোজা আঘাত হানে ফিঞ্চের প্যাডে আম্পায়ার আঙ্গুল তুলে জানান দেন আউট।

গ্যালারি জুড়ে চিৎকার। এরই মাঝে ক্রিজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ। ডেভিড ওয়ার্নারকে সাথে নিয়ে দলপতির যোগ্য জবাব যেন সেই চিৎকারগুলোকে থামিয়ে দিয়েছে। ১২৭ রানের জুটি ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে গ্যালারীতে থাকা হাজার হাজার মানুষের মনে।

এই ভয়ংকর হয়ে যাওয়া জুটিকে ভাঙবে কে? দায়িত্বটা নিলো সাকিব আল হাসান। সাকিবের ঘূর্ণিতে স্মিথ যখন আউট, ঠিক পরের ওভারেই মিরাজের টিপিক্যাল অফস্পিনে ওয়ার্নারও ফিরতি পথে। আবারো সরগরম গ্যালারী। এরপর সাকিব, মিরাজ, মুস্তাফিজদের সাথে অবশ্যই মাশরাফি চেপে ধরে অস্ট্রেলিয়াকে। ৪৯ ওভার শেষে ২৮১ রান করা অস্ট্রেলিয়া হারিয়েছে ৭ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার শেষ ভরসা হিসেবে আছে ম্যাক্সওয়েল। ছয় বলে করতে হবে আট রান।

মুস্তাফিজের বাকি এক ওভার, মাশরাফিরও তাই। অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ মুস্তাফিজের হাতেই বল তুলে দিলো। দূর থেকে সাকিব দৌড়ে এসে মাহমুদুল্লাহ ও মুস্তাফিজকে কি যেন বলল? তিনজনেই হাসি হাসি মুখ।

এই শেষ টেনশনের মুহূর্তে কেউ হাসে? বিরক্তিকর। দেখা যাচ্ছে, মাহমুদুল্লাহ মাশরাফিকে ডাকছে। মুস্তাফিজের হাত থেকে বল নিয়ে মাশরাফির হাতে তুলে দিলো ক্যাপ্টেন। তার মানে, জীবনের শেষ ম্যাচে দলকে বাঁচানোর দায়িত্ব এখন কেবল তাঁর।

প্রথম বল, মাশরাফি দৌড় শুরু করল। বল ছাড়লো, ম্যাক্সওয়েলও সজোরে ব্যাট ঘুরালো। ডিপ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা মোসাদ্দেক ক্যাচ ধরার জন্য ঝাঁপ দিলো। কিন্তু একি! সে ক্যাচ ধরতে পারলো না। তাকে ফাঁকি দিয়ে বল সীমানার বাইরে। চার রান। গ্যালারিতে থাকা প্রতিটি দর্শকের মাথায় হার। পাঁচ বলে দরকার কেবলই চার।

দর্শকদের সাথে হতাশ বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রাও। পরের বল, ম্যাক্সওয়েল আবারো জোরের উপর ব্যাট চালালো, এবারে সোজাসুজি। নিজের বলে নিজেই দুর্দান্ত ক্যাচ মাশরাফির। ম্যাক্সওয়েল আউট। চিৎকারে যেন ফেটে পড়বে গ্যালারি। চার বলে চার রান, বাকি আছে দুই উইকেট। তৃতীয় বল, প্যাট কামিন্স এই বল পাঠাতে চাচ্ছিল লং অনে। কিন্তু দুর্দান্ত মাশরাফির অসাধারণ ফিল্ডিং। রান নিতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া, তিন বলে চার। পরের বলে গায়ের যত শক্তি আছে তা দিয়েই ব্যাট ঘুড়িয়েছে বটে, বল ব্যাট ছুঁয়ে মুশফিকুর রহিমের গ্লাভসে। কামিন্স আউট, ওভারে মাশরাফির দ্বিতীয় আঘাত। দুই বলে চার, বাকি এক উইকেট।

ক্রিকেটের ক্লাইম্যাক্স জমে উঠেছে। শেষ দৃশ্যে কি হয়, কি হয়। উত্তেজনা, ভয় সব মিলেমিশে একাকার। ক্যারিয়ারের শেষ ওভারের মাশরাফিকে দেখে সেই তরুণ মাশরাফিকেই মনে পড়ছে। অদম্য, দুর্দান্ত, অসাধারণ, হার না মানা এক যোদ্ধা। পঞ্চম বল নিয়ে আসছে মাশরাফি। জস হ্যাজেলউডের ব্যাটের কানা ছুঁয়ে স্ট্যাম্পের পাশ ঘেষে ছুটছে বল। মুশফিকুর রহিম, বাম পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল থামালো বোধহয় পরাজয়টাই আটকালো। এক রান পেল অস্ট্রেলিয়া।

শেষ বলে, তিন রান দরকার। মাশরাফি ছুটছেন, বল করলেন। মিড উইকেটের দিকে ঘুরিয়েই দৌড় দিল স্টার্ক-হ্যাজেলউড। সাকিব ছুটে আসছে বলের দিকে। দ্বিতীয় রানের জন্য দৌড় দুই ব্যাটসম্যানের। সাকিব এক হাতে বল তুলল, ছুড়ে দিলো মাশরাফির উদ্দেশ্যে। মাশরাফি নিলেন, ভাঙলেন স্ট্যাম্প। হ্যাজেলউড পৌঁছাতে ব্যর্থ। আম্পায়ার আঙ্গুল তুলে জানালেন আউট। বাংলাদেশ জিতেছে, এক রানে।

মাশরাফি বসে পড়লেন। খেলোয়াড়রা ছুটে আসছে তার দিকে। এমন এক জয়ের আনন্দ বিন্দু মাত্র নেই গ্যালারি জুড়ে। সবার চোখেই পানি। খেলোয়াড়রা জড়িয়ে আছে মাশরাফিকে। নিজের প্রিয় মানুষ, অভিভাবককে বিদায় দিতে কারই বা মন চায়? এ এক অদ্ভুত দৃশ্য…

এতটুকু লিখে আর লিখতে পারছি না। কলম চলছে না। কল্পনায় এমন এক বিদায়কে মেনে নিতে কষ্ট হয় যে!
না, মাশরাফি এখনো বিদায় নেয় নি। সে খেলবে আরো অনেকটা দিন। একদিন যে বিদায় জানাতেই হবে। সেদিন পারবো তো মেনে নিতে?
মাশরাফিদের কি আদৌ বিদায় হয়? মাশরাফিরা থাকে প্রতিটি চার, ছয়, উইকেটে। প্রতিটি জয়ের উল্লাসে মিশে থাকে মাশরাফির অনুপ্রেরণা।
তুমি মাশরাফি, তুমিই অতুলনীয়…..
কখনো বিদায় বলোনা!!!