সাত বছরেও নেভেনি চুড়িহাট্টার শোকের আগুন, বিচারের অপেক্ষা…!


সাত বছরেও নেভেনি চুড়িহাট্টার শোকের আগুন, বিচারের অপেক্ষা...!

পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলি আর কেমিক্যাল গুদামের স্তূপ থেকে উঠে আসা সেই লেলিহান শিখা আজও তাড়া করে ফেরে চুড়িহাট্টাবাসীকে। ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ সেই বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডির সপ্তম বার্ষিকী। সাত বছর আগে এই রাতে চুড়িহাট্টার মোড়ে ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে ছড়িয়ে পড়া অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৭১ জন মানুষ। কিন্তু সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও বদলায়নি স্বজনহারা পরিবারগুলোর চোখের জল আর বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষা।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টা। চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড় ছিল চিরাচরিত যানজটে স্থবির। রিকশা, পিকআপ আর মানুষের ভিড়ে ঠাসা সেই সরু রাস্তায় হঠাৎ বিকট শব্দে ফেটে পড়ে গ্যাস সিলিন্ডার, যা মুহূর্তেই রূপ নেয় নরককুণ্ডে। ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় থাকা প্লাস্টিক দানা, পারফিউম ও বডি স্প্রে’র অবৈধ রাসায়নিক গুদাম আগুনের তীব্রতাকে বাড়িয়ে দেয় শতগুণ। পালানোর পথটুকুও পায়নি সড়কে আটকে থাকা মানুষগুলো। কেউ রিকশায় বসা অবস্থায়, কেউ বা দোকানের সাটার নামাতে গিয়েই জীবন্ত দগ্ধ হয়েছেন।

স্মৃতির দেয়ালে কান্নার দাগ

আজ শুক্রবার সকালে চুড়িহাট্টার সেই অভিশপ্ত মোড়ে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্য। স্থানীয় মসজিদগুলোতে আয়োজন করা হয়েছে দোয়া মাহফিলের। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো জড়ো হয়েছেন তাদের হারানো স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনায়। তবে প্রার্থনার সুরের আড়ালে জমাট বেঁধে আছে চাপা ক্ষোভ। নিহতদের পরিবারের একজন সদস্যের কণ্ঠে ঝরে পড়ল সেই আক্ষেপ— “বছর ঘুরে দিনটি এলে সবাই সান্ত্বনা দেয়, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। কিন্তু আমাদের আপনজনদের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার কি আমরা দেখে যেতে পারব?”

বিচারপ্রক্রিয়ার মন্থর গতি

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। পুলিশ তদন্ত শেষে আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করলেও আইনি জটিলতা আর সাক্ষী হাজির করার ধীরগতির কারণে বিচারকাজ এখনো ঝুলে আছে। সাত বছরেও রায় না হওয়াকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। আইনজীবীদের মতে, এত বড় একটি ট্র্যাজেডির বিচার দ্রুত শেষ করা গেলে তা অন্য ব্যবসায়ীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করত।

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির সাত বছর: একনজরে মূল তথ্য

  • ঘটনার তারিখ ও সময়: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রাত ১০:৩০ মিনিট।

  • নিহতের সংখ্যা: সরকারি হিসেবে ৭১ জন (ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্তসহ)।

  • আগুনের উৎস: চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের ‘ওয়াহেদ ম্যানশন’।

  • প্রধান কারণ: আবাসিক ভবনে অবৈধ কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থের গুদাম।

  • মামলার অবস্থা: চার্জশিট দাখিল হলেও বিচারকাজ এখনো চলমান।

কেমিক্যালমুক্ত পুরান ঢাকা: কতদূর?

নিমতলী ট্র্যাজেডির পর চুড়িহাট্টার ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল পুরান ঢাকার ঝুঁকি। এরপর প্রশাসন একাধিকবার আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল গুদাম সরানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আজও চকবাজারের অলিগলি ঘুরলে দেখা যায় প্লাস্টিক আর বডি স্প্রে’র আড়ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযানের কিছুদিন পরই আবার পুরনো চেহারায় ফিরে আসে গুদামগুলো। এই উদাসীনতা আরেকটি বড় দুর্ঘটনার সংকেত দিচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চুড়িহাট্টা কেবল একটি আগুনের গল্প নয়, এটি তদারকি সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা আর অতি মুনাফালোভী এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর লালসার সাক্ষী। ৭১টি পরিবারের স্বপ্ন ওই এক রাতেই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।