সাকিব আহমেদের গল্প “স্বপ্নে বাংলাদেশ, স্বপ্নের বাংলাদেশ”



সাকিব আহমেদ

সাল ২০৪৩। বাংলাদেশের হোম অব ক্রিকেট, মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে আজ লাখো মানুষের ঢল। ৯০০০০ ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ। লাল-সবুজের জার্সি আর সবুজের মাঝে রক্তিম আভার বাংলাদেশের রঙে রঙিন সারা গ্যালারী।

আজ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। স্বাগতিক বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত। গত এক যুগ ধরে দুর্দান্ত খেলতে থাকা টিম টাইগার্স, বাংলাদেশের জন্য এখনো অধরা থেকে গেছে বিশ্বকাপ। শেষ দুই আসরের ফাইনালে যেয়েও স্বপ্ন ভাঙ্গার জ্বালা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের। শেষবার তো মাত্র তিন রানের জন্য হারতে হয়েছিল। তাই আজ জিততেই হবে। সেই অপেক্ষায় সমগ্র বাংলাদেশ।

২০৩৯ থেকে ২০৪৩… এই চার বছরে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। স্বপ্নপূরনের লক্ষ্যে আবারো লড়াইয়ে টিম টাইগার্স। কি হবে এবার? হবে তো? নাকি আবারো চোখের জল সঙ্গী হবে?

টানটান উত্তেজনার এই ম্যাচে টসে জিতে ব্যাটিংয়ে ভারত। ব্যাট হাতে নামল দুই ওপেনার বিশাল ভৌমিক ও রোহান কুলকার্নী। বল হাতে প্রস্তুত বর্তমান সময়ের দ্রুততম বোলার সাজিদ হাসান। প্রথম বলে কোন ঝুঁকি না নিয়ে দেখেশুনে ছেড়ে দিল বিশাল। ওভারের তৃতীয় বল আসল বিদ্যুতের গতিতে। ১৫৫ কি.মি. গতিতে আসা বল ব্যাট পেড়িয়ে আঘাত আনল মিডল স্ট্যাম্পে। উড়ে গিয়ে পড়ল অনেক দূরে। চিৎকারে গোটা গ্যালারী।

পরবর্তী ব্যাটসম্যান হিসেবে নামলো মোহন সিং। প্রথম ওভারের শেষ বল আবারো বিদ্যুৎ বেগে। লেগ সাইডে ফ্লিক করতে গিয়ে গতির কাছে পরাস্ত। বল সোজা আঘাত হানে প্যাডে খেলোয়াড়দের সাথে সমস্বরে দর্শকদের আউটের আবেদন। আম্পায়ার আঙুল তুলে জানিয়ে দিল মোহন শেঠকে ফিরে যেতে হবে। দর্শকদের চিৎকারে যেন বাংলার আকাশ ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। স্কোর বোর্ডে ২ উইকেট হারিয়ে ০ রান।

দলকে বাঁচাতে ব্যাটিংয়ে ভারত দলপতি বিজয় রায়। রোহনকে সাথে নিয়ে আসতে আসতে ভাল একটা অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে দলকে। তাদের ১৮৬ রানের জুটি টাইগার ক্যাপ্টেনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। নিশ্চুপ গোটা গ্যালারী। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা এই জুটিকে ভাঙতে বাংলাদেশের অধিনায়কের শেষ অস্ত্র প্রয়োগ। লেগ স্পিনার সাদের ঘূর্ণিতে রোহান আউট। নিষ্প্রাণ থাকা গ্যালারী উল্লাসে উল্লাসে আবারো মুখরিত।

পরের ওভারে সাজিদের গতির কাছে ব্যাটসম্যান আরেকবার পরাজিত। আরেকটি উইকেটের পতন। এরপর কোন ব্যাটসম্যানকেই দাঁড়াতে দেয় নি বাংলাদেশের বোলাররা। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে ভারত। সাজিদের পাঁচ আর সাদের তিন উইকেটের সুবাদে ৪৭.৩ ওভারে ২৭১ রানে সবকটি উইকেট হারায়। বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য ২৭২ রান।

২৭২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ধীরে সুস্থে রান তুলতে থাকে দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান জিয়াউল হক ও রাজু আহমেদ। তাদের দৃষ্টিনন্দন সব ক্রিকেটীয় শটে ওপেনিং জুটিতে ২০ ওভারে স্কোরবোর্ডে ১০২। এরপরই দৃশ্যপটে ক্লাইম্যাক্স। স্পিনার অমিতাভ চাহালের এক বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে সীমানার কাছে দুর্দান্ত এক ক্যাচে প্যাভিলিয়নের পথে জিয়াউল হক।

তারপরই কেমন যেন ছন্দপতন। ব্যাটসম্যানদের ব্যার্থতা আর আশা যাওয়ার মিছিলে স্বপ্নগুলো একটু একটু করে মলিন হয়ে যেতে শুরু করেছে। কোন ব্যাটসম্যানই বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকে থাকতে পারেনি। ২০৭ রানে অষ্টম উইকেটের পতন ঘটলে সবকিছুই শেষ হয়ে গেছে বলাই যায়। গ্যালারী জুড়ে নীরবতা বিরাজ করছে।

কিন্তু তখনো বাকি ছিল ক্রিকেটীয় ক্লাইম্যাক্স। ক্রিজে আছে বাংলাদেশের ম্যাচ ফিনিশার হিসেবে খ্যাত পলাশ হাসান। টেলেন্ডারদের নিয়ে বাকি দায়িত্বটা তার। তার ব্যাটের উপর ভর করে আবারো জয়ের আশা জেগে উঠে সমর্থকদের মনে। আর তার দায়িত্বশীল ব্যাটিংকে যোগ্য সঙ্গ দিতে থাকে তার পার্টনাররা। ৪৯ ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে স্কোরবোর্ডে ২৫৫ রান।

হাতে ছয়টি বল। জয়ের জন্য রান প্রয়োজন ১৭। শেষ ওভারের প্রথম বল, ইয়োর্কের প্রচেষ্টা। ডাউন দ্যা পিচে এসে বলটাকে ফুলটস বানিয়ে পলাশের ইনসাইড আউট শট। কাভারের উপর দিয়ে বল সীমানার বাইরে। ছয় রান…

পরের বল, লেগ সাইডে ফ্লিক করল পলাশ। শর্ট ফাইন লেগে থাকা ফিল্ডারকে পরাস্ত করে দৃষ্টিনন্দন চারের মার। শেষ চার বলে দরকার সাত রান। তৃতীয় বল, গতি কমিয়ে করা বাউন্সার মিস করল পলাশ। পরের বলটির গতি কাজে লাগিয়ে লেট কাট। থার্ড ম্যানে থাকা ফিল্ডারের দুর্দান্ত ফিল্ডিং। দুই রানেই সন্তুষ্ট থাকতে হল পলাশকে। জোরের উপর করা পরের বল সোজা এসে আঘাত হানে পলাশের বুকে। ব্যাথায় ককিয়ে উঠলেও ব্যাট ছাড়েনি সে। জয়ের নেশায় পাগল হয়ে যাওয়া পলাশ নিজের ব্যাথাকে তুচ্ছ করে লড়াই করে যাচ্ছে। আজ জিততেই হবে।

শেষ বলে দরকার পাঁচ রান। পারবে তো পলাশ? স্তব্ধ গ্যালারী। গ্যালারীসহ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ প্রার্থনায় মগ্ন। কি হবে এখন? বল হাতে দৌড় দিল বোলার, বল করল… ডান্সিং ডাউন দ্যা উইকেটে এসে সজোরে ব্যাট চালাল পলাশ। লং অনের মাথার উপর দিয়ে সীমানার বাইরে। ছয় ছয় ছয়!

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন।

বাধ ভাঙ্গা উল্লাসে কাঁপছে গ্যালারী, কাঁপছে বাংলার আকাশ-বাতাস। গ্যালারী থেকে রাস্তা। লাখো মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায়।

সবার সাথে গলা ফাটিয়ে আমিও রাস্তায় নেমে পড়লাম। আজ আনন্দের সীমা নেই, নেই উৎসবের বাধা। বাংলাদেশ বাংলাদেশ ধ্বনিতে আজ সব মুখরিত। হঠাৎই মুখে পানির ছোঁয়া অনুভব করলাম। কি হল? বৃষ্টি পড়ে নাকি?? আকাশের দিকে তাকালাম। কই বৃষ্টি হয় না তো? আবারো মুখে ঠান্ডা পানির পরশ পেলাম।

ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। কোথায় বাংলাদেশ? আর কোথায় লাখো মানুষ? ঘরের দেয়ালে মাশরাফি-সাকিবদের ছবি দেখে বুঝলাম নিজের ঘরে আছি। এতক্ষণ যা ছিল সব স্বপ্ন। আমার সামনে আমার ছোট বোন তিথি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে পানির বোতল।

‘কি রে ভাই? এত জোরে চিৎকার দিলি যে?’ তিথির প্রশ্ন করল।

জবাব দিলাম না। ভাবছি হয়ত একদিন এই স্বপ্নটা পূরন হবে। বিশ্বকাপের সেই সোনালী ট্রফিতে হাত রাখবে আমার সোনার বাংলার সোনার ছেলেরা। সেই সময়ের অপেক্ষায় রইলাম।