সাকিব আহমেদ
‘Bowled him, full and straight. The Bangladesh tigers have knocked the lions out of the world cup.’
নাসির হুসাইনের কথাগুলো এখনো কানে বাজে। চার বছর পেরিয়ে গেলেও পুরোনো না হওয়া কথাগুলো এখনো বিশ্বাস যোগায়, ভরসা যোগায়। সেদিন যে ইতিহাসের সাক্ষী হতে হয়েছিল। হয়েছিল সব অবজ্ঞা-অবহেলার জবাব দিয়ে বিজয়ের গল্প লেখার।
অস্ট্রেলিয়ার এডিলেড হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে নেই কোনো দুঃখ। আছে কেবল সুখ, আছে তৃপ্তি। বিজয়ের বেশে স্বপ্ন পূরণের পরিতৃপ্তিতে সুদূর এডিলেড থেকে ঢাকা – সব এক হয়ে উঠেছিল। লাল-সবুজের রঙে মিলেমিশে একাকার বাংলাদেশ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া সহ গোটা বিশ্ব।
বিশ্বকাপে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন মাশরাফি। বোধহয় সৃষ্টিকর্তার কাছে করুণ আকুতি, নিরাশ করো না প্রভু। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ভালো কিছু নিয়েই ফিরবেন। তিনি ফিরেছেন, স্বপ্ন পূরণের মধুর স্মৃতি নিয়ে। যেই স্মৃতিতে এখনো বাংলাদেশ গল্প লেখে, আলোচনার উপলক্ষ পায়।
পাড়ার মোড় কিংবা রাস্তার পাশের টং – চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। আড্ডা-গল্পে চলে এডিলেডের সবুজ গালিচায় বাংলাদেশের নামে লেখা সেই বিজয়ের রাতটুকু। যে রাতের নায়ক বনে যাওয়া রুবেল হয়ে ওঠেন সেসব গল্পের মধ্যমণি।
এতটাই কি সহজ ছিল জয়ের পথ? বোধহয় না। আগের ওভারেই দুর্দান্ত খেলতে থাকা ক্রিস ওকসের ক্যাচ ফেলে দিয়েছেন তামিম ইকবাল। ভয়-ভীতি ছড়ানোর জন্য ওই একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। মাথায় হাত, হতাশায় ভরা মুখ – এডিলেডের সবুজ মাঠে ওদের এগোরজন সহ দর্শক থেকে শুরু করে ঢাকার বড় বড় পর্দায় খেলা দেখা প্রতিটি মানুষের মনে শঙ্কা।
স্বপ্ন যেন না ভাঙে। রিকশা চালানো ওই বৃদ্ধটা কিংবা বছর দশেক বয়সী ওই বড়লোকের আদরের দুলালী সেই ছেলেটাও হাত দুটো জড়ো করে রেখেছে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে, এবারের মত জিতিয়ে দাও। এভাবে যেন কাঁদতে না হয়।
সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে মাশরাফি বল তুলে দিয়েছেন রুবেলের হাতে। ৪৯ তম ওভার, সাকিব এগিয়ে এলেন। রুবেলকে বললেন, জীবনের সেরা ছয়টি বল হয়ে যাক আজ এই বাইশ গজে।
বল হাতে নিয়ে রুবেল কি ভাবছিলেন, তিনিই হয়ত সেটি বলতে পারবেন। পুরো দেশের স্বপ্ন যে তার কাঁধে। লাল-সবুজের মর্যাদা রাখতে পারবে তো? ভাবছিলেন হয়ত, কিছুদিন আগে যে খলনায়ক হতে হয়েছিল, তা ভুলে এভাবে নায়ক হওয়ার সুযোগ কি ছাড়া যায়!
রুবেল সে সুযোগ ছাড়েননি। ওভারের তৃতীয় বল ইয়র্কার লেন্থে পড়ে এন্ডারসনকে পেরিয়ে যতক্ষণে আঘাত হানে স্ট্যাম্পে, ততক্ষণে হিরো বনে গিয়েছেন তিনি। এন্ডারসন পিছন ফিরে তাকাননি। পেছন ফিরে তাকায়নি কেউই।
রুবেলের দৌড় শুরুর সাথে সাথে ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। দুইদিকে দুই হাত প্রসারিত করে কালো মতন ছেলেটা যখন এডিলেডের সবুজ গালিচাকে বাংলাদেশের রানওয়ে বানিয়ে ছুটছেন, মাশরাফি তখন ঘাসের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছেন। বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে তার উপর গিয়ে পড়ছিলেন সবাই।
এর ঠিক দুই বল আগে যখন রুবেলকে বল দেওয়া হয়, ইংল্যান্ডের তখন জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১২ বলে ১৬ রান। প্রথম বলটি ১৪২ গতিতে করা বলে স্টুয়ার্ট ব্রড পরাস্ত হয়ে হয়েছিলেন বোল্ড। ঠিক দুই বল পরে একই পরিণতিতে এন্ডারসনও ধরাশায়ী।
রুবেল এর আগেও ছুটেছিলেন, ক্রিকেটের সবুজ গালিচায় নিজের পদক্ষেপে রাঙিয়েছিলেন ঠিক পাঁচ বছর আগে, ২০১০ সালে।
নিউজিল্যান্ডের বোলার কাইল মিলস হঠাৎই ব্যাটসম্যান বনে গেছেন সেদিন। উইকেটে সেট হয়ে গেছেন দারুণভাবে, অপরাজিত আছেন তেত্রিশ রানে। জয় পরাজয়ের মাঝে ব্যবধান চার বলের, রান বাকি চারটি। নিউজিল্যান্ডের কাছে তখন হোয়াইটওয়াশ বাঁচানোর মরণপণ লড়াই।
বাংলাদেশে এসে এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি পড়তে হবে হয়ত ভাবেই নি তারা। এমন সময় দৌড় শুরু করল রুবেল। ওভারের প্রথম বলে চার খেয়েছিলেন লেগ সাইডে বল দিয়ে। মিলস হয়ত আবারো এমনটিই ভেবেছিলেন।
উইকেট ছেড়ে সরে গিয়েছিলেন বেশ খানিকটা। ইয়র্কার লেন্থে বল ছুড়েছেন রুবেল। একটি খট করে আওয়াজ। না বল ব্যাটে লাগেনি, উপড়ে ফেলেছে স্ট্যাম্প। মিরপুরের হোম অফ ক্রিকেটে তখন উন্মাদনার বন্যা, সমর্থকদের চিৎকারে কান পাতা দায়। কমেন্ট্রিবক্সে আতাহার আলী খান গলা ফাটাচ্ছেন বাংলাওয়াশ বাংলাওয়াশ চিৎকারে।
আর রুবেল? মিরপুরে তখন উড়ছেন তিনি। ছুটছেন, যেন বাঁধনহারা কোনো এক নৌকার মাঝি। এই পথের শেষ নেই, এই পথ ধরেই ছুটতে হবে দূর-বহুদূর।
২০১০ থেকে ২০১৫, ২০১৫ থেকে ২০১৯ – আবারও গল্পের প্লট তৈরি। এবার যে নায়ক হতে হয়!
একজন রুবেল ও হাজারো গল্পের পটভূমি। আমি আবার সেই রুবেলকে দেখতে চাই, রুবেলের হাত ঘুরে লক্ষ্য কোটি গল্পের উপাখ্যান পেতে চাই!
মিরপুর কিংবা এডিলেড…. রুবেলের ট্রেড হয়ে যাওয়া দৌড়গুলো আবারো চোখের সামনে দেখতে চাই।
হবে নাকি আরেকবার? স্বপ্নপূরণের দৌড়…..

