মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে এক অভাবনীয় কূটনৈতিক মোড় নিল ইরান। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আগে হামলা না হলে তেহরান আর কোনো আক্রমণ চালাবে না—শুক্রবার এমন এক নীতিগত ঘোষণা দিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদও এই সিদ্ধান্তের অনুমোদন দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে রয়টার্স।
সংঘাতের ছায়া ও তেহরানের দুঃখপ্রকাশ
গত কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় যে বারুদ আর উত্তেজনার মেঘ জমেছিল, তা কাটাতে যেন কিছুটা নরম সুর শোনা গেল তেহরানের কণ্ঠে। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে সরাসরি দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের এই সামরিক পদক্ষেপ কোনো একক দেশ বা জাতির বিরুদ্ধে শত্রুতা থেকে নয়, বরং পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা থেকে উৎসারিত।
শুক্রবার দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এই ‘অপ্ররোচিত হামলা না করার’ নীতির অনুমোদন দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এখন মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার।
‘শত্রুতা নেই, লক্ষ্য যখন মার্কিন ঘাঁটি’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে এই পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দাবি করেন, প্রতিবেশীদের প্রতি তেহরানের কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। বাঘেই বলেন, “আমাদের প্রতিবেশীদের লক্ষ্য করে হামলা করতে হচ্ছে বলে আমরা সত্যিই দুঃখিত। তবে সমস্যাটি দেশগুলোকে নিয়ে নয়, বরং তাদের ভূখণ্ডে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে নিয়ে।”
ইরানের অভিযোগ, তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো মার্কিন ঘাঁটিগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোর মাটি ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে ইরান যখন আত্মরক্ষার্থে পাল্টা আঘাত হানে, তখন তা অনিচ্ছাকৃতভাবে ওই দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা দেয়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে ভবিষ্যতে কেবল সরাসরি আক্রান্ত হলেই পাল্টা ব্যবস্থা নেবে তেহরান।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:
নীতিগত পরিবর্তন: প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে সরাসরি উসকানি বা হামলা না এলে ইরান কোনো সামরিক অভিযান চালাবে না।
নেতৃত্বের অনুমোদন: শুক্রবার ইরানের উচ্চপর্যায়ের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ এই নীতির আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দিয়েছে।
দুঃখপ্রকাশ: সাম্প্রতিক হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা আতঙ্কিত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।
মার্কিন ফ্যাক্টর: ইরানের দাবি অনুযায়ী, প্রতিবেশীদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোই উত্তেজনার মূল উৎস।
ইসরায়েলি পাল্টা আঘাত: তেহরানের শান্তির বার্তার মাঝেই ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা ইরানি সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে সমন্বয়কৃত হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলি আক্রমণ ও অস্থিতিশীল ভবিষ্যৎ
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই নমনীয় অবস্থানের ঠিক উল্টো মেরুতে অবস্থান করছে ইসরায়েল। আইডিএফ দাবি করেছে, তারা ইরানি সরকারের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও একটি বড় ধরনের আক্রমণ সম্পন্ন করেছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আগুন পুরোপুরি নিভে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে ইরান যখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলাতে চাইছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক হামলা তেহরানকে পুনরায় কঠোর অবস্থানে ফিরে যেতে বাধ্য করতে পারে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

