৩৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ


৩৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের সুখবর মিলেছে। প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) চাঙ্গা ভাব এবং রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশের মোট রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দিন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের স্বীকৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে এই হিসাব ২৯ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

রেকর্ড ছাড়াল রিজার্ভের অঙ্ক

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সোমবার সন্ধ্যায় রিজার্ভের এই হালনাগাদ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বর্তমানে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্সের উচ্চপ্রবাহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত ডলার ক্রয় রিজার্ভের ভিতকে আরও মজবুত করেছে।”

পরিসংখ্যান বলছে, এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার (বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন)। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে রিজার্ভে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসেই প্রবাসীরা প্রায় ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে মাসিক আয়ের অন্যতম রেকর্ড।

কেন বাড়ছে রিজার্ভ?

অর্থনীতিবিদদের মতে, হুন্ডি বন্ধে কড়াকড়ি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম বাজারের সাথে সমন্বয় করায় প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হচ্ছেন। এছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচন নীতি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুফল পেতে শুরু করেছে দেশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ১৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে বাজার থেকে এই ডলার কেনা হয়। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং ডলারের সরবরাহ অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে যাতে দাম খুব বেশি কমে না যায়, সে লক্ষ্যেই এই ‘স্মার্ট হস্তক্ষেপ’ করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু)

রিজার্ভ বাড়লেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক লেনদেন বা ‘আকু’র দেনা পরিশোধ। সাধারণত প্রতি দুই মাস অন্তর বাংলাদেশ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের দেনা পরিশোধ করে। আগামী মাসেই প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি দায় পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে রিজার্ভে সাময়িকভাবে কিছুটা টান পড়তে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমানে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের যে ধারা রয়েছে, তাতে আকু পেমেন্টের পরেও রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক পর্যায়েই থাকবে।

দীর্ঘদিন ধরে ডলার সংকটে ভুগতে থাকা বাংলাদেশের জন্য ৩৪ বিলিয়ন ডলারের এই রিজার্ভ নিঃসন্দেহে এক বড় স্বস্তি। এটি কেবল আমদানিকারকদের এলসি (ঋণপত্র) খোলার দুশ্চিন্তা কমাবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতার বার্তা পৌঁছে দেবে। তবে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর ওপর আরও জোর দিতে হবে।

অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো এক নজরে:

  • মোট গ্রস রিজার্ভ: ৩৪.০৬ বিলিয়ন ডলার।

  • বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ: ২৯.৪৮ বিলিয়ন ডলার।

  • রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি: চলতি অর্থবছরে (ফেব্রুয়ারি ৭ পর্যন্ত) প্রায় ২১.৭%।

  • ডলারের বিনিময় হার: ১২২.৩০ টাকা (আন্তঃব্যাংক গড়)।