আহসান এইচ মনসুরের বিদায়, নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান



দেশের আর্থিক খাতের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতারত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোস্তাকুর রহমান। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি এখন প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পরিবর্তনের হাওয়া

দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে কাজ করা আহসান এইচ মনসুরের বিদায় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন গভর্নর নিয়োগের সারসংক্ষেপ ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন, যা এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

প্রক্রিয়া অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ফাইলটি যাবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়ার পরপরই জারি করা হবে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নির্ধারণে নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হতে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখন সরগরম মতিঝিল পাড়া।

নেপথ্যে কে এই নতুন গভর্নর?

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। আন্তর্জাতিক আর্থিক রাজনীতি এবং ম্যাক্রো-ইকোনমিকস বা সামষ্টিক অর্থনীতিতে তাঁর বিশেষ দখল রয়েছে।

বিদেশে কর্মরত উচ্চশিক্ষিত কোনো বিশেষজ্ঞকে ফিরিয়ে এনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়াটা সরকারের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের জঞ্জাল পরিষ্কার করার জন্য একজন আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল।

কেন এই পরিবর্তন?

আহসান এইচ মনসুর যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন দেশ এক অস্থির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যার সুফল ও সমালোচনা—দুই-ই দৃশ্যমান। তবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতের সংস্কারে নতুন গতি আনার পরিকল্পনা করছেন। এই নতুন ‘রোডম্যাপ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সম্ভবত নেতৃত্বে বদল আনা হচ্ছে।

প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের দিকে নজর দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডল থেকে কাউকে আনার অর্থ হলো বৈশ্বিক মানের ব্যাংকিং কাঠামোর সাথে বাংলাদেশের মেলবন্ধন ঘটানো।”

নতুন গভর্নরের জন্য পথটা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ হবে না। ব্যাংক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ডলার সংকটের স্থায়ী সমাধান করা হবে তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ। এছাড়া আইএমএফ (IMF)-এর শর্ত পূরণ এবং ঋণের কিস্তি ছাড়ের প্রক্রিয়াগুলো তদারকি করার গুরুভারও তাঁর কাঁধেই থাকবে। অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে মাঠপর্যায়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তিনি কীভাবে সামাল দেবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।