ইরান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে হুতিরা; গাজা সংঘাতের আঁচ এবার লোহিত সাগরের নীল জলরাশি ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত হানতে শুরু করেছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেবল ইসরায়েলের নিরাপত্তা ঝুঁকিই বাড়ায়নি, বরং আন্তর্জাতিক নৌপথ অবরুদ্ধ হওয়ার নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। যা বিশ্ব বাণিজ্যে এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বদলে যাওয়া রণকৌশল ও তাসের ঘর
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুতিদের হামলা ছিল মূলত বিক্ষিপ্ত ও প্রতীকী। উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে ইসরায়েল এসব হামলা সহজেই প্রতিহত করতে পেরেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। একটি হুতি ড্রোন তেল আবিবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে, যাতে প্রাণ হারান এক বেসামরিক নাগরিক।
এই ঘটনাটি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘অজেয়’ ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা এখন কেবল পরিমাণ নয়, বরং গুণগত মানের দিক থেকেও তাদের অস্ত্রের আধুনিকায়ন ঘটিয়েছে। যদিও ইয়েমেন থেকে আসা হামলাগুলো ইসরায়েলের জন্য বড় কোনো অস্তিত্ব সংকটের কারণ নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে এটি নেতানিয়াহু প্রশাসনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের ‘শ্বাসরোধ’ করার শঙ্কা
হুতিদের প্রকৃত শক্তি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক অবস্থান। তারা যদি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে পূর্ণ মাত্রায় নতুন হামলা শুরু করে, তবে তার প্রভাব হবে ‘ডোমিনো ইফেক্ট’-এর মতো। লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং কন্টেইনার পরিবহনের ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়।
যদি এই রুটটি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তবে জাহাজগুলোকে উত্তমাশা অন্তরীপ (Cape of Good Hope) ঘুরে আফ্রিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। এতে জ্বালানি খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি পণ্য পৌঁছাতে দেরি হবে অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিন। ফলাফল হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিত্যপণ্যের দাম এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
হুতি-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রধান দিকগুলো (Key Points):
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ড্রোন হামলা প্রমাণ করেছে যে, হুতিরা এখন রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ‘লো-কস্ট’ ড্রোন প্রযুক্তিতে দক্ষ।
অর্থনৈতিক ব্লকেড: লোহিত সাগর ও বাব-আল-মানদাব প্রণালী লক্ষ্য করে হামলা হলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা।
বিমা ও মাশুল: বাণিজ্যিক জাহাজের বিমা খরচ ইতিমধ্যে কয়েক গুণ বেড়েছে, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ গ্রাহকের পকেট কাটছে।
আঞ্চলিক মেরুকরণ: হুতিদের এই তত্পরতা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ‘প্রক্সি’ যুদ্ধের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করছে।
সমর কৌশলে নতুন মাত্রা
ইসরায়েল ও পশ্চিমা মিত্ররা হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে ইয়েমেনে বিমান হামলা চালালেও তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছে না। রুক্ষ পাহাড়ি অঞ্চলে হুতিদের মোবাইল লাঞ্চারগুলো খুঁজে পাওয়া খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো কঠিন। ফলে সামরিক শক্তির চেয়ে হুতিরা এখন অর্থনৈতিক অস্ত্রকে বেশি শক্তিশালী মনে করছে। তাদের মূল লক্ষ্য—ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিশ্ব বাণিজ্যকে জিম্মি করা।

