ভয়াল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কাটল আজ শুক্রবারের দুপুর। বেলা ১টা ৫৩ মিনিটে রাজধানী ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সাতক্ষীরার আশাশুনিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া এই কম্পনে মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় সাতক্ষীরা ও খুলনায় ঘরবাড়ি এবং আসবাবপত্র প্রবলভাবে দুলতে থাকে, যা অনেককে রাস্তায় নামিয়ে আনে।
সাতক্ষীরায় উৎস, কাঁপল ওপার বাংলাও
ইউরোপীয় ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (EMSC) জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৩। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং খুলনা থেকে ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ৩৫ কিলোমিটার।
উৎসস্থল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হওয়ায় ঝাঁকুনির তীব্রতা ছিল বেশ প্রখর। সাতক্ষীরার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হঠাৎ করেই পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার মতো অনুভূত হয় এবং জানালার কাঁচ ও আসবাবপত্র সশব্দে কেঁপে ওঠে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বেশ কিছু এলাকাতেও এই কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পাওয়া যায়নি।
উদ্বেগের কেন্দ্রে ‘ফেব্রুয়ারি’: ২৭ দিনে ১০ বার
সাধারণত বাংলাদেশে ভূমিকম্পের উৎসস্থল হিমালয় পাদদেশ বা সিলেটের ডাউকি ফল্টে দেখা গেলেও, সাতক্ষীরার মতো সমতল ও উপকূলীয় অঞ্চলে ৫.৩ মাত্রার কম্পন ভূতাত্ত্বিকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। তবে সবচেয়ে ভীতি জাগানিয়া বিষয় হলো চলতি মাসের পরিসংখ্যান। ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে আজ ২৭ তারিখ পর্যন্ত মোট ১০ বার ছোট-বড় ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে বাংলাদেশে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘনঘন এই মৃদু ও মাঝারি মাত্রার কম্পনগুলো কোনো বড় ধরনের টেকটোনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। মাটির নিচে জমা হওয়া বিশাল শক্তি অল্প অল্প করে বের হয়ে আসছে নাকি এটি কোনো ‘মেগা ডিজাস্টার’ বা মহাদুর্যোগের পূর্বাভাস, তা নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে বিশ্লেষণ চলছে।
এক নজরে আজকের ভূমিকম্প ও পরিসংখ্যান
পাঠকদের সতর্কতার জন্য আজকের ঘটনার প্রধান তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
সময়: শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; দুপুর ১টা ৫৩ মিনিট।
মাত্রা: ৫.৩ (রিখটার স্কেল)।
কেন্দ্র: আশাশুনি, সাতক্ষীরা (খুলনা থেকে ৪৭ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে)।
গভীরতা: ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ কিলোমিটার নিচে।
প্রভাবিত এলাকা: ঢাকা, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বরিশাল এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ।
মাসিক চিত্র: ১-২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশে মোট ১০ বার কম্পন অনুভূত।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি
রাজধানী ঢাকার বহুতল ভবনগুলোতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে কম্পন অনুভূত হওয়ার পর হুড়োহুড়ি করে নিচে নামার প্রবণতা দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একজন অধ্যাপক জানান, “সাতক্ষীরা অঞ্চলে ৫-এর ওপর মাত্রা থাকা মানে এটি মাঝারি ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প। উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি নরম হওয়ায় সেখানে কম্পনের প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। তবে ফেব্রুয়ারিতে ঘনঘন কম্পন হওয়াটা স্বাভাবিক নয়; এটি আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ও ভবন নির্মাণের ত্রুটিগুলো সংশোধনের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা।”
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সূত্র জানিয়েছে, তারা সারাদেশের ইউনিটগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলে কোনো ফাটল বা ভূমিধস হয়েছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রকৃতির এই আকস্মিক আচরণ মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে। ২৭ দিনে ১০ বার মাটি কাঁপার এই ধারাবাহিকতা নিছক কাকতালীয় না-ও হতে পারে। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নির্মাণ বিধিমালা (Building Code) কঠোরভাবে অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি।

