ইরানের ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে কে বসছেন, তা নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনকারী শক্তিশালী সংস্থা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাদের চূড়ান্ত ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করেছে। পরবর্তী নেতার নাম গোপন রাখা হলেও গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে যে, প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মেজ ছেলে মোজতাবা খামেনিই হতে যাচ্ছেন শিয়া শাসিত এই দেশটির পরবর্তী ভাগ্যবিধাতা।
গোপনীয়তার মোড়কে নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা
ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ পরিষদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য আহমেদ আল আমলহোদা আজ রোববার সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য ভোট প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, “পবিত্র এই দায়িত্ব অর্পণের জন্য ভোট গ্রহণ সম্পন্ন এবং একজন যোগ্য নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম দেশ ও বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা করা হবে।”
বিশেষজ্ঞ পরিষদের এই ঘোষণায় ইরানের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণত এই পরিষদের কার্যক্রম অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে পরিচালিত হয়। তবে এবার আহমেদ আল আমলহোদার এই প্রকাশ্য মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ক্ষমতার পালাবদল এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আলোচনায় মোজতাবা খামেনি: উত্তরাধিকার নাকি রাজনৈতিক সমীকরণ?
১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান শাসন করেছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার মৃত্যুর পর থেকেই উত্তরসূরি হিসেবে বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এলেও সব ছাপিয়ে সামনে আসছে তার ছেলে মোজতাবা খামেনির নাম। ৫৪ বছর বয়সী মোজতবা দীর্ঘদিন ধরেই পর্দার আড়াল থেকে ইরানের ক্ষমতা কাঠামো ও রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোজতাবা খামেনিকে গত কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে তৈরি করা হয়েছে। যদিও ইরানি বিপ্লবের মূল মন্ত্র ছিল বংশতান্ত্রিক শাসনের অবসান, তবে বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার খাতিরে বিশেষজ্ঞ পরিষদ সম্ভবত খামেনি পরিবারের ওপরই আস্থা রাখতে চাইছে। পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মোজতাবা ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় সমর্থন লাভ করেছেন।
ইরানের বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে নতুন নেতা:
ইরান বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা—সব মিলিয়ে নতুন নেতার কাঁধে থাকবে হিমালয়সম পাহাড়ের চাপ।
একনজরে বর্তমান পরিস্থিতির মূল তথ্যসমূহ:
নির্বাচক সংস্থা: ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’।
সর্বশেষ আপডেট: ভোট গ্রহণ সম্পন্ন, নাম ঘোষণা বাকি।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী: মোজতাবা খামেনি (আলী খামেনির মেজ পুত্র)।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৮৯ সাল থেকে আলী খামেনি ক্ষমতায় ছিলেন।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ: অর্থনৈতিক সংস্কার, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সামরিক কৌশল বজায় রাখা।
ক্ষমতার পালাবদলের বৈশ্বিক প্রভাব
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হাতেই থাকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ। ফলে মোজতাবা খামেনি যদি শেষ পর্যন্ত মসনদে বসেন, তবে তেহরানের কট্টরপন্থী অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বরং তিনি বাবার লিগ্যাসি ধরে রেখে রেভল্যুশনারি গার্ডের ক্ষমতা আরও বাড়াতে পারেন।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মোজতবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের মতে, মোজতবা একজন ধূর্ত রাজনৈতিক কৌশলী, যিনি সরাসরি জনসমক্ষে না এলেও শাসনযন্ত্রের নাড়ি নক্ষত্র চেনেন। তবে তার নিয়োগ নিয়ে ইরানের ভেতরে উদারপন্থী বা সংস্কারপন্থীদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় কি না, সেটিও দেখার বিষয়।

