চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সা-পিএসজির দাপট, জয়খরা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ম্যানইউ



উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে দাপুটে পারফরম্যান্স দেখিয়েছে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। বড় ব্যবধানের জয় তুলে নিয়ে ইউরোপীয় মঞ্চে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে দুই দল। অন্যদিকে, টানা নয় ম্যাচ জয়হীন থাকার হতাশা কাটিয়ে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে জয় পেয়েছে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত তিন ম্যাচে বার্সেলোনা ৩-০ গোলে অ্যাস্টন ভিলা, পিএসজি ৬-০ গোলে ভিয়ারিয়াল এবং ম্যানইউ ৩-২ গোলে রোমাকে পরাজিত করেছে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের তৃতীয় রাউন্ডে পিএসজির কাছে হার এবং পরবর্তী সময়ে লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদের কাছে পরাজয়—টানা দুই হারে কিছুটা চাপে ছিল বার্সেলোনা। তবে নিজেদের মাঠ ন্যু ক্যাম্পে অ্যাস্টন ভিলাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে জয়ের ধারায় ফিরেছে হানসি ফ্লিকের দল।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে বার্সেলোনা। সপ্তম মিনিটেই প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। গোল কিক নিতে গিয়ে বড় ভুল করেন অ্যাস্টন ভিলার জোয়াও গোমেস। তার বাড়ানো বল সরাসরি পেয়ে যান লামিনে ইয়ামাল। বক্সের ভেতর থেকে কোনাকুনি শটে বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন এই তরুণ স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড।

গোল হজমের পর অবশ্য ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে ভিলা। নিকোলাস জ্যাকসন ও জোহান মানজাম্বির কয়েকটি আক্রমণ বার্সার রক্ষণভাগে চাপ তৈরি করে। তবে গোলরক্ষক জোয়ান গার্সিয়ার দৃঢ়তায় সমতায় ফিরতে পারেনি সফরকারীরা। একাধিক সুযোগ নষ্ট করার খেসারত দিতে হয় উনাই এমেরির দলকে।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তভাবে নিজেদের হাতে নেয় বার্সা। ৫২ মিনিটে ফারমিন লোপেজের পাস থেকে শট নেন রাফিনিয়া। বলটি অ্যাস্টন ভিলার ডিফেন্ডার পাউ তোরেসের গোড়ালিতে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে প্রবেশ করে। ৬৪ মিনিটে জোয়াও কানসেলোর পাস থেকে কাছাকাছি দূরত্বে বল জালে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল পূর্ণ করেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। চলতি মৌসুমে ১৩ ম্যাচে রাফিনিয়ার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯-এ।

এই জয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ঘুরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও ফিরে পেয়েছে বার্সেলোনা। অন্যদিকে, হারের কারণে লিগ পর্বে অ্যাস্টন ভিলার শতভাগ জয়ের রেকর্ড ভেঙে গেছে। ম্যাচটি ভিলার কোচ উনাই এমেরির জন্যও হতাশার হয়ে থাকল। বার্সেলোনায় ১৬ ম্যাচে এটি তার ১৫তম হার। দলের উন্নতি দেখতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ভিলার একনিষ্ঠ সমর্থক প্রিন্স উইলিয়ামও।

অন্যদিকে, স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালের মাঠে গোল উৎসব করেছে পিএসজি। ৬-০ গোলের বিশাল জয়ের পথে এক ম্যাচেই একাধিক রেকর্ড গড়েছে লুইস এনরিকের শিষ্যরা। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে চার গোল করার রেকর্ড নিজেদের করে নিয়েছে ফরাসি ক্লাবটি।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় তোলে পিএসজি। প্রথম ১৭ মিনিটের মধ্যেই ভিয়ারিয়ালের জালে চারবার বল পাঠায় তারা। শুরুতে জোয়াও নেভেস, দিজিরে দুয়ে ও সেনি মায়ুলু গোল করেন। এরপর ১৭ মিনিটে ফ্যাবিয়ান রুইজের গোলে চার গোলের মাইলফলক পূর্ণ হয়। এর আগে ২০১১ সালে দিনামো জাগরেবের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিটের মধ্যে চার গোল করার রেকর্ড গড়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস লিখল পিএসজি।

শুধু দ্রুততম চার গোলের রেকর্ড নয়, চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম চার ম্যাচে ২০ গোল করার কীর্তিও গড়েছে দলটি। এর আগে স্লোভান ব্রাতিস্লাভার বিপক্ষে ছয়টি এবং ম্যানচেস্টার সিটি ও বার্সেলোনার বিপক্ষে চারটি করে গোল করেছিল পিএসজি। পাশাপাশি টানা চার ম্যাচে অন্তত চারটি করে গোল করা প্রতিযোগিতার ইতিহাসে প্রথম দল হওয়ার কীর্তিও তাদের।

দ্বিতীয়ার্ধেও গোলের ক্ষুধা কমেনি পিএসজির। ৫০ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান বাড়ান ফ্যাবিয়ান রুইজ। এরপর ম্যাচের ৭৮ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র চার মিনিটের মাথায় গোল করেন ১৭ বছর বয়সী ডেভিড বলি। চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেক ম্যাচেই গোল করে বিশেষ কীর্তি গড়েন এই তরুণ ডিফেন্ডার। ১৭ বছর ২৮৫ দিন বয়সে গোল করে পিএসজির ইতিহাসে দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম চ্যাম্পিয়নস লিগ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। এই তালিকায় তার ওপরে রয়েছেন ওয়ারেন জাইর-এমেরি।

এদিকে, ওল্ড ট্রাফোর্ডে রোমার বিপক্ষে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে দীর্ঘদিনের জয়খরা কাটিয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ম্যাচের প্রথমার্ধে দুই গোল হজম করে বড় ধাক্কা খেলেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ইংলিশ ক্লাবটি। দলের জয়ের নায়ক ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ম্যাথিউস কুনহা, যিনি দ্বিতীয়ার্ধে পরপর দুটি গোল করেন।

ম্যাচের শুরুটা অবশ্য স্বাগতিকদের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। মাতিয়াস সোলে ও ডনিয়েল মালেনের গোলে মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় রোমা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও প্রথমার্ধে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ম্যানইউ। ফলে বিরতিতে হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় স্বাগতিকদের।

ম্যাচের আগে ক্লাবের মালিক গ্লেজার্স পরিবারের বিরুদ্ধে সমর্থকদের প্রতিবাদও ছিল আলোচনায়। স্ট্রেটফোর্ড এন্ডে সবুজ ও সোনালি বেলুন উড়িয়ে প্রতিবাদ জানান তারা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ২১তম মিনিটে মাঠে টেনিস বলও ছুড়ে মারেন সমর্থকদের একাংশ। তবে মাঠের বাইরের অস্থিরতা পেছনে ফেলে দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে দলটি।

প্রত্যাবর্তনের সূচনা করেন অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেস। পুনরায় নেওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান কমান তিনি। এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় ম্যানইউ। ৮৩ মিনিটে প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সমতা ফেরান কুনহা। এর মাত্র তিন মিনিট পরই আবারও জ্বলে ওঠেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। তার নেওয়া শট কাছের পোস্টে লেগে জালে জড়ালে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা।

দ্বিতীয় গোলের পর জার্সি খুলে উদযাপন করায় হলুদ কার্ড দেখেন কুনহা। পরে ইনজুরি সময়ে আরেকটি চ্যালেঞ্জের কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। তবে তার লাল কার্ড জয়ের আনন্দে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।

এই জয়ে চলতি মৌসুমে তৃতীয় জয়ের দেখা পাওয়ার পাশাপাশি টানা নয় ম্যাচের জয়হীন ধারার অবসান ঘটিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে কোচ মাইকেল ক্যারিকের ওপর থেকে কিছুটা চাপও কমেছে।