মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে ইরানে মার্কিন হামলা নিয়ে সব মহলেই চরম শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আক্রমণের ছক কষছে বলে খবর ছড়ানোর পর থেকেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের দামামা বাজছে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির কেন্দ্রে এখন অবস্থান করছে বিবদমান দুই দেশের সবচেয়ে বিধ্বংসী দুটি সমরাস্ত্র, যা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘোলাটে করে তুলেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নতুন করে সামরিক সংঘাতের দিকে পা বাড়াতে পারে, এমন আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলে এখন তুঙ্গে। ওয়াশিংটনের শীর্ষ সমরকৌশলীদের রাডারে রয়েছে ইরানের অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামো। মার্কিন অস্ত্রাগারের অন্যতম ভয়ংকর অ-পারমাণবিক বোমা জিবিইউ-৪৩/বি (GBU-43/B) ব্যবহার করে তেহরানের শক্ত সামরিক ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে পেন্টাগন। প্রায় ২১ হাজার ৬০০ পাউন্ড বা ৯.৮ টন ওজনের এই বিশাল বোমাটি বিস্তীর্ণ এলাকা নিমিষেই মাটিতে মিশিয়ে দিতে সক্ষম। বাতাসে বিস্ফোরিত হওয়া এই বোমাটি চারপাশের পরিবেশের ওপর যে মাত্রার ধাক্কা বা শকওয়েভ সৃষ্টি করে, তা সত্যি অভাবনীয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে আইএস জঙ্গিদের সুড়ঙ্গে এই বোমার প্রথম ব্যবহার অনুমোদন করেছিলেন। ওই হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হলেও, ইরানের পাহাড়ের গভীরে থাকা পাথুরে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে এর চূড়ান্ত কার্যকারিতা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মাঝে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন গ্রানাইট পাথরের পুরু স্তর ভেদ করে এটি কতটা গভীরে আঘাত হানতে পারবে। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা মূলত এই ধরনের আক্রমণ সামরিক ক্ষতি সাধনের পাশাপাশি তেহরানের ওপর চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই ছকেছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মাধ্যমে তারা ইরানকে পুরোপুরি নতি স্বীকার করাতে না পারলেও সংঘাতের গতিপথ নিজেদের অনুকূলে আনতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য হুমকির পর মোটেও হাত গুটিয়ে বসে নেই তেহরান। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, শত্রুদের হতবাক করে দিতে তারা এমন এক সুপার-অস্ত্র উন্মোচন করতে যাচ্ছেন যা সামরিক বিশ্বে ‘ফাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত। এটি যুক্তরাষ্ট্রের এমওএবি-এর চেয়েও ওজনে ভারী এবং এর ধ্বংসক্ষমতা বহুগুণ বেশি বলে জোরালো দাবি করছে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকেই এমন একটি ১০ টন ওজনের ভারী প্রচলিত বোমা তৈরির কাজ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছিল ইরান। ইলিউশিন (Il-76) স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট এয়ারলিফটার থেকে নিক্ষেপযোগ্য এই বোমাটি মার্কিন আগ্রাসন রুখতে এবং শত্রুর মনে কাঁপন ধরাতেই জনসমক্ষে আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে আইআরজিসি। এটি প্রকাশ্যে এলে এই অঞ্চলের স্নায়ুযুদ্ধ সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগ্রাসন মোকাবিলায় এবার নিজেদের চিরাচরিত সামরিক কৌশলেও আমূল পরিবর্তন এনেছে তেহরান। এতদিন ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি ছিল মূলত আত্মরক্ষামূলক—অর্থাৎ কেউ আগে তাদের সীমানায় আঘাত করলে তবেই তারা পাল্টা জবাব দিত। কিন্তু আইআরজিসি এবার সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, সেই পুরনো দিন শেষ।
এখন থেকে কোনো রাষ্ট্র যদি তাদের ওপর সামান্যতম আক্রমণও চালায়, তবে ইরান শুধু প্রতিরোধই গড়বে না, বরং এমন এক ভয়াবহ আক্রমণাত্মক পাল্টা হামলা চালাবে যার তীব্রতা শত্রুপক্ষকে চরমভাবে বিপন্ন করবে। এই অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল এবং সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় দেড় গুণ বাড়ানোর দাবি তেহরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক আত্মবিশ্বাসেরই সুস্পষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল বিশ্বের জ্বালানি বাজার এই পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকিতে এরই মাঝে অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা এই উত্তেজনারই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত যদি সত্যিই ইরানে মার্কিন হামলা বাস্তবে রূপ নেয়, তবে হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌরুটে অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।

