মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ইরানের জন্য ১৫ দফার এক বিশাল ‘শান্তি প্রস্তাব’ পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই পরিকল্পনার নেপথ্য কাহিনী। তেহরান যদি এই কঠিন শর্তগুলো মেনে নেয়, তবেই মিলবে যুদ্ধ বিরতি ও অর্থনৈতিক অবরোধ মুক্তির নিশ্চয়তা।
পর্দার আড়ালে কূটনীতির চাল
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে জল্পনা ছিল তুঙ্গে। নতুন এই ১৫ দফা প্রস্তাবটি মূলত তেহরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের একটি কৌশলগত মোড়ক। মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য কেবল যুদ্ধ থামানো নয়, বরং ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া।
পেন্টাগন এবং তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের মতে, ইরান যদি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশকের ছায়াযুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠছে, তেহরান কি তাদের সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে এই তথাকথিত ‘শান্তি’ মেনে নেবে?
প্রস্তাবের মূল শর্তাবলী: কী আছে এই ১৫ দফায়?
যদিও পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রধান শর্তগুলো অত্যন্ত কঠোর। এর মধ্যে রয়েছে:
পারমাণবিক কর্মসূচির পূর্ণ বিলুপ্তি: ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) পরিদর্শকদের জন্য সব দুয়ার খুলে দিতে হবে।
ব্যালেস্টিক মিসাইল প্রজেক্ট বন্ধ: কেবল পরমাণু নয়, ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতাও সীমিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন প্রত্যাহার: হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতিদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস: সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেন থেকে ইরানের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটানো।
শর্ত মানলে ইরানের প্রাপ্তি কী?
ট্রাম্পের এই ‘ডিল’ কেবল শর্তের পাহাড় নয়, এতে কিছু টোপও দেওয়া হয়েছে। তেহরান যদি এই ১৫ দফা মেনে নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র নিম্নলিখিত সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে:
অবরোধ প্রত্যাহার: গত কয়েক বছর ধরে ইরানের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরা সব ধরণের কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।
বিশ্ব বাজারে তেল বিক্রির বৈধতা: ইরান পুনরায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাধা ছাড়াই অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি করতে পারবে।
স্থায়ি কূটনৈতিক সম্পর্ক: ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে সরাসরি কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন।
আর্থিক সহায়তা: ধ্বংসপ্রায় ইরানি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বিশেষ প্যাকেজের নিশ্চয়তা।
একনজরে ট্রাম্পের কৌশলী পদক্ষেপ
“এটি কোনো সাধারণ সমঝোতা নয়; বরং ইরানকে বিশ্ব ব্যবস্থার মূল ধারায় ফেরার শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। ব্যর্থ হলে সামরিক সংঘাতের শঙ্কা আরও তীব্র হবে।” — রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
চাপের কৌশল: নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন ট্রাম্প।
ইসরায়েলি ফ্যাক্টর: এই প্রস্তাবের পেছনে ইসরায়েলের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে, যা অঞ্চলটির সামরিক ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারে।
চীনের ভূমিকা: বেইজিংয়ের সাথে ইরানের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের লাগাম টেনে ধরাও এই চুক্তির অন্যতম গোপন উদ্দেশ্য।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
ট্রাম্পের এই ১৫ দফা প্রস্তাব এখন তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির টেবিলের ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব মেনে নেওয়া মানে ইরানের গত ৪ দশকের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের বিসর্জন দেওয়া। অন্যদিকে, প্রত্যাখ্যানের অর্থ হলো অর্থনৈতিক ধস এবং সম্ভাব্য সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবা খেলায় ট্রাম্পের এই চাল তেহরানকে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটি কি সত্যিই শান্তির দূত হয়ে আসবে, নাকি নতুন কোনো মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত—তা সময়ই বলে দেবে।

