‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতেই ইরানে হামলা’ : ট্রাম্প



ইরানের সঙ্গে চলমান ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাত এই সপ্তাহে না থামলেও ‘খুব দ্রুতই’ এর অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সোমবার (১৬ মার্চ) এক বিবৃতিতে তিনি জানান, পারমাণবিক যুদ্ধ ও সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রুখতেই তার প্রশাসনকে এই সামরিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।


সংঘাতের সমাপ্তি নিয়ে ট্রাম্পের বয়ান

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল পরিস্থিতির মাঝে সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন। তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ট্রাম্পের মতে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষ হওয়ার পর বিশ্ব বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ স্থানে পরিণত হবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে এই যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু বিশ্বশান্তি এবং আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব ছিল।” তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রশাসন এখন যুদ্ধের চেয়ে বরং একটি দ্রুত ও সম্মানজনক প্রস্থান বা সমাপ্তির পথ খুঁজছে।

পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কা ও ‘বাধ্যতামূলক’ সিদ্ধান্ত

এবারের ভাষণে ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সঠিক সময়ে ইরানে এই হামলা না চালাত, তবে তেহরান হয়তো পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতো। আর একবার পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হলে তা অবধারিতভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিত।

নিজের আক্রমণাত্মক নীতিকে রক্ষণাত্মক হিসেবে তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, “এটি কোনো ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত ছিল।” অর্থাৎ, ইরানকে নিষ্ক্রিয় না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত—এমনটিই বোঝাতে চেয়েছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার মতে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে যে অভিযান চালাচ্ছে, তা বিশ্বকে এক মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা করার জন্য একটি ‘সার্জিক্যাল প্রসেস’।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ

দীর্ঘ ১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক সংকট আমরা দেখেছি, তবে এবারের উত্তেজনা ভিন্ন মাত্রার। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা চরমে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘খুব শিগগির যুদ্ধ শেষ হবে’ বলে ট্রাম্প যে আশা জুগিয়েছেন, তার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং বিশ্বনেতাদের মধ্যস্থতার বিষয়টিও কাজ করছে।

তবে তেহরান থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো নমনীয় মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ট্রাম্পের এই আশ্বাসের বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে এবং ইরান আদৌ অস্ত্র বিরতিতে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রধান দিকগুলো এক নজরে:

  • দ্রুত সমাপ্তি: যুদ্ধ বন্ধ হতে খুব বেশি সময় লাগবে না, তবে এই সপ্তাহে তা শেষ হচ্ছে না।

  • নিরাপদ বিশ্ব: এই সংঘাতের অবসান হলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি।

  • অনিচ্ছা সত্ত্বেও পদক্ষেপ: ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে একে ‘দায়িত্ব’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

  • তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি: হামলা না করলে পারমাণবিক সংঘাত শুরু হতো, যা বিশ্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিত।

  • বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত: এই সামরিক অভিযানকে ‘চয়েস’ নয় বরং ‘নেসেসিটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে যেমন যুদ্ধ শেষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ ভয় দেখিয়ে সামরিক অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শেষ পর্যন্ত যদি খুব শিগগির এই সংঘাতের অবসান ঘটে, তবে তা হবে বর্তমান শতাব্দীর অন্যতম বড় কূটনৈতিক বা সামরিক বিজয়।

কিন্তু যদি এই ‘শিগগির’ শব্দটি কেবল কথার কথা হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর সংকটে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।