দেশে এলো ৪.৭১ লাখ প্রবাসীর পোস্টাল ব্যালট: ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন



আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে প্রবাসীদের উৎসাহ এখন তুঙ্গে। এর প্রতিফলন হিসেবে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের পাঠানো ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৫৭টি পোস্টাল ব্যালট ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রথমবারের মতো এত বিশাল পরিসরে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার এই প্রক্রিয়া দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিবন্ধন করা এই বিপুল সংখ্যক ব্যালট এখন দেশের মাটিতে এবং তা সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

প্রযুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের মেলবন্ধন

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, এবারই প্রথম আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রবাসীদের জন্য সহজতর ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ চালু করা হয়েছে। প্রবাসীরা যেখানেই থাকুন না কেন, এই অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে ডাকযোগের মাধ্যমে ব্যালট পাঠানোর সুযোগ পেয়েছেন।

সালীম আহমাদ খান জানান, এখন পর্যন্ত মোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট প্রবাসীদের ঠিকানায় পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৩৩ জন প্রবাসী তাদের ব্যালট হাতে পেয়েছেন এবং ৫ লাখ ১২ হাজার ৯১৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্পন্ন করেছেন।

বিদেশের মাটিতে ভোট দিয়ে তা নিজ দেশের পোস্ট অফিসে জমা দেওয়ার হারও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৫ লাখ ২ হাজার ৪৮৭ জন প্রবাসী ভোটার নিজ নিজ দেশের ডাকবিভাগে তাদের ব্যালট জমা দিয়েছেন, যার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছে।

এক নজরে পোস্টাল ভোটের পরিসংখ্যান (১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত):

* মোট প্রবাসী নিবন্ধনকারী: ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ জন।
* বাংলাদেশে আসা মোট ব্যালট: ৪,৭১,৯৫৭টি।
* ভোট প্রদান সম্পন্নকারী প্রবাসী: ৫,১২,৯১৬ জন।
* দেশের অভ্যন্তরে পোস্টাল ভোট নিবন্ধন: ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন।
* রিটার্নিং কর্মকর্তাদের প্রাপ্ত ব্যালট (অভ্যন্তরীণ ও প্রবাসী মিলিয়ে): ৩ লাখ ১০ হাজার ১৫৪টি।
* সর্বমোট অ্যাপ ব্যবহারকারী ভোটার: ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন।

নির্বাচনী আমেজে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে তা সম্ভব হতো না। কিন্তু এবার নির্বাচন কমিশন এবং ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের সমন্বিত প্রচেষ্টায় কয়েক লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধা দেশের ভাগ্য নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও কাতারসহ বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রবাসীরা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন।

সালীম আহমাদ খান আরও জানান, শুধু বিদেশেই নয়, দেশের ভেতরে যারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন বা নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত আছেন, তারাও এই অ্যাপের সুফল পাচ্ছেন। ইন-কান্ট্রি বা অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ভোটিংয়ের আওতায় ৭ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন, যাদের ভোটও দ্রুত সংগ্রহ করা হচ্ছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ডাকযোগে আসা এই ব্যালটগুলো অত্যন্ত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার সাথে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। ভোট গণনার দিন সাধারণ ভোটের সাথেই এই পোস্টাল ব্যালটগুলো গণনা করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পোস্টাল ব্যালটের এই সফল প্রয়োগ বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। প্রবাসীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তারা সবসময়ই অংশীদার হতে চান। এখন কেবল অপেক্ষা ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলের, যেখানে এই ৪.৭১ লাখ ব্যালট বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।