নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নাটোরের বড়াইগ্রামে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ধানাইদহ এলাকা।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে জামায়াত কর্মীকে মারধরের জেরে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই বড়াইগ্রামের নগর ইউনিয়ন এলাকায় দুই দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। গত শুক্রবার বিকেলে ধানাইদহ বাজারে জামায়াত কর্মী সাব্বির হোসেনকে মারধর করে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীরা। এই ঘটনার মীমাংসার জন্য শনিবার সকালে একটি বৈঠকের কথা ছিল।
তবে বৈঠক শুরুর আগেই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার ধানাইদহ পূর্বপাড়া এলাকায় উভয় পক্ষের সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এক পর্যায়ে উত্তেজনার পারদ চড়লে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এসময় কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণের বিকট শব্দে এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে।
রণক্ষেত্রে পরিণত গ্রাম, ব্যাপক ভাঙচুর
সংঘর্ষ চলাকালীন শুধু লাঠিসোঁটা বা ইটপাটকেল নয়, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের খবরও পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা ধানাইদহ পূর্বপাড়া এলাকায় অন্তত ৫ থেকে ৬টি বাড়ি ও কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালায়। লুটপাটের অভিযোগও তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা।
গুরুতর আহতদের মধ্যে রয়েছেন:
হাসিনুর রহমান: নগর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির (আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন)।
আসাব সরকার: নগর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি।
রফিকুল ইসলাম ও সাব্বির: জামায়াত কর্মী।
নাজমা বেগম: সংঘর্ষের সময় নিজ বাড়িতে আক্রান্ত হওয়া এক গৃহবধূ।
আহতদের মধ্যে দুইজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং বাকিদের পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি
খবর পেয়ে বড়াইগ্রাম থানা পুলিশ, বিজিবি এবং সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব ও জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি এখন শান্ত থাকলেও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংঘর্ষের সাথে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ইতোমধ্যেই ৪ জনকে আটক করেছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর বিএনপি কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংঘর্ষের পর থেকে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এক নজরে মূল ঘটনা:
স্থান: ধানাইদহ পূর্বপাড়া, বড়াইগ্রাম, নাটোর।
সময়: শনিবার সকাল ১০:৩০ মিনিট।
কারণ: পূর্ববর্তী মারধরের জেরে পাল্টা আক্রমণ ও রাজনৈতিক আধিপত্য।
হতাহত: অন্তত ১০ জন আহত (উভয় পক্ষ)।
আইনশৃঙ্খলা: পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন; ৪ জন আটক।

