জাতীয় সংসদের চিরাচরিত তিক্ততা ও নেতিবাচক সংস্কৃতি পেছনে ফেলে এক নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করতে চায় বিএনপি।
শনিবার গুলশানে দলের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আগামী দিনের সংসদ হবে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যা দেখে দেশবাসী বলবে—এমন সংসদই তারা চেয়েছিল।
সংসদীয় শিষ্টাচারে পরিবর্তনের আভাস
দেশের সংসদীয় ইতিহাসে গত কয়েক দশকে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ, ওয়াকআউট এবং অশালীন বাক্যবিনিময় একটি সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছিল। এই ‘বিষাক্ত’ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা। শনিবার (৭ মার্চ) গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অধিবেশনে সালাহউদ্দিন আহমদ এই নতুন রূপরেখার কথা জানান।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছি। সংসদ হবে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, কেবল গায়ের জোরে কথা বলার জায়গা নয়। আমরা এমন একটি সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই যেখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দল—উভয় পক্ষই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কথা বলবে।”
প্রশিক্ষিত নেতৃত্বের গুরুত্ব
বিএনপির এই বিশেষ কর্মশালার মূল লক্ষ্যই ছিল সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের (এমপি) সম্যক ধারণা দেওয়া। সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, একজন জনপ্রতিনিধি যদি সংসদের নিয়ম-কানুন ও শিষ্টাচার না জানেন, তবে সেখানে গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
তিনি আরও যোগ করেন, “ভবিষ্যতের সংসদ অধিবেশন দেখে জাতি আশ্বস্ত হবে। আমরা আমাদের সদস্যদের এমনভাবে প্রস্তুত করছি যাতে তারা রাজপথের মতো সংসদকেও জনকল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। জনতা যখন সংসদীয় কার্যক্রম সরাসরি দেখবে, তারা যেন গর্ববোধ করতে পারে যে তাদের প্রতিনিধিরা প্রকৃত অর্থেই দায়িত্বশীল।”
বিএনপির সংসদীয় সংস্কারের প্রধান দিকসমূহ:
যুক্তিনির্ভর বিতর্ক: ব্যক্তিগত আক্রমণ পরিহার করে তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের সমালোচনা ও গঠনমূলক প্রস্তাবনা দেওয়া।
অংশগ্রহণমূলক সংসদ: কেবল সংখ্যাতত্ত্বের রাজনীতি না করে প্রতিটি বিল ও সিদ্ধান্তের ওপর চুলচেরা বিশ্লেষণ করা।
অতীতের ভুল সংশোধন: অতীতে সংসদের ভেতরে যে নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখা।
জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলো সরাসরি সংসদে জোরালোভাবে তুলে ধরা।
সংসদ সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি: নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও গবেষণামূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের আপডেট রাখা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে
সালাহউদ্দিন আহমদের এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি ‘সাহসী এবং সময়োপযোগী’ সিদ্ধান্ত। যদি সত্যিই বিএনপি এই ধারা বজায় রাখতে পারে, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।
তবে রাজনীতির মাঠে কথা ও কাজের মিল রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের নেতিবাচক সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে। সেই শিকড় উপড়ে ফেলে নতুন সংস্কৃতি রুয়ে দেওয়া কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে সংসদের প্রথম কয়েক দিনের কার্যক্রমের ওপর।

