রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা কি কেবল রাজপথের প্রটোকলেই সীমাবদ্ধ? ডিজিটাল যুগে এর উত্তর লুকিয়ে আছে হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনে। সম্প্রতি সচিবালয় থেকে গুলশানের বাসভবনে ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রীর হাতে দেখা গেছে এক বিরল মডেলের স্মার্টফোন, যা নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে শুরু হয়েছে তুমুল হইচই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্মার্টফোন হাতে কোন ব্র্যান্ডের?
পর্দার আড়ালে যে প্রযুক্তি
সাধারণত বিশ্বনেতারা আইফোন বা স্যামসাংয়ের কাস্টমাইজড সংস্করণ ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পছন্দে দেখা গেছে ভিন্নতা। গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই ফোনটি মূলত সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সিরিন ল্যাবস’-এর তৈরি ‘সিরিন ফিনি’ (Sirin Finney)। এটি সাধারণ কোনো স্মার্টফোন নয়, বরং বিশ্বের প্রথম ব্লকচেইন-নির্ভর স্মার্টফোন হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালে বাজারে আসা এই ফোনটি মূলত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ক্রিপ্টো-ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকের জন্য তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যারের যুগে সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহার করা যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে সিরিন ফিনি এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ফোনের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘স্লাইডিং’ বা গোপন স্ক্রিন। ফোনটি সচল করতে হলে ব্যবহারকারীকে ডাবল সিকিউরিটি চেকের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা হ্যাকারদের পক্ষে ভেদ করা প্রায় অসম্ভব।
যেভাবে কাজ করে সিরিন ফিনি
তারেক রহমানের ব্যবহৃত এই ফোনটির উপরের অংশে একটি আলাদা মেকানিক্যাল স্লাইডার রয়েছে। যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেনদেন বা এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদান করতে হয়, তখনই মূল স্ক্রিনের পেছন থেকে আরেকটি গোপন স্ক্রিন বেরিয়ে আসে। এই দ্বিতীয় স্ক্রিনটি ফোনের মূল অপারেটিং সিস্টেম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। ফলে ফোনের মূল সিস্টেমে কোনো ম্যালওয়্যার থাকলেও সেটি এই গোপন স্ক্রিনের তথ্য চুরি করতে পারে না।
দুই স্ক্রিনে প্রদর্শিত কোড বা নম্বর মিলিয়ে তবেই ফোনে প্রবেশ করা যায়। এটি মূলত একটি ‘কোল্ড স্টোরেজ’ ওয়ালেটের মতো কাজ করে, যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। এই ফোনের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম (সিরিন ওএস) অ্যান্ড্রয়েডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও এর নিরাপত্তা স্তর কয়েক গুণ শক্তিশালী।
সিরিন ফিনি-র বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য:
ব্লকচেইন ইন্টিগ্রেশন: বিশ্বের প্রথম ব্লকচেইন স্মার্টফোন যা তথ্যের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে।
ডুয়াল স্ক্রিন প্রযুক্তি: ফোনের ভেতর লুকানো অতিরিক্ত স্ক্রিন যা ফিজিক্যাল সিকিউরিটি লেয়ার হিসেবে কাজ করে।
সাইবার সুরক্ষা: এতে রয়েছে বিল্ট-ইন আইপিএস (Intrusion Prevention System), যা রিয়েল টাইম আক্রমণ শনাক্ত করতে সক্ষম।
মূল্য: এই আভিজাত্য এবং নিরাপত্তার দামও নেহাত কম নয়; মডেলভেদে এর দাম ৯৯৯ থেকে ৩৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তার নতুন বার্তা
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই ফোন ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় তথ্য চুরি বা ফোনে আড়ি পাতার ঘটনা বৈশ্বিক রাজনীতিতে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা রাষ্ট্রীয় নথিপত্র যদি অসুরক্ষিত ডিভাইসে থাকে, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তারেক রহমান এমন একটি ডিভাইস বেছে নিয়েছেন যা আধুনিক এনক্রিপশন প্রযুক্তির শেষ কথা।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরের এই প্রযুক্তি কি কেবল বিলাসিতা? উত্তরটি হলো ‘না’। এটি বিলাসিতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার একটি অপরিহার্য ঢাল। সিরিন ল্যাবসের এই ফোনটি স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরে চললেও এর মূল শক্তি এর নিজস্ব ইকোসিস্টেম, যা ব্যবহারকারীকে ট্র্যাকিং বা স্পাইং থেকে সুরক্ষা দেয়।
ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প বাস্তবায়নে যখন সরকার সচেষ্ট, তখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য নিরাপত্তার এই সচেতনতা প্রশংসার দাবি রাখে। তারেক রহমানের হাতে থাকা এই ‘সিরিন ফিনি’ কেবল একটি ফোন নয়, বরং সাইবার যুদ্ধের যুগে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি আধুনিক হাতিয়ার।

