ভোটার তালিকা থেকে বাদ মীর জাফরের ৩০০ বংশধর


ভোটার তালিকা থেকে বাদ মীর জাফরের ৩০০ বংশধর

পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদ জেলায় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার মসনদ হারানো নবাব মীর জাফর আলী খানের প্রায় ৩০০ জন বংশধরের নাম এবারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন খোদ ‘ছোটে নবাব’ সৈয়দ রেজা আলী মির্জাও, যা নিয়ে জেলাজুড়ে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।


ইতিহাসের আঙিনায় অধিকারের লড়াই

মুর্শিদাবাদের কেল্লা নিজামত, যা একসময় বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ সেখানে এক অদ্ভুত প্রশাসনিক জটিলতা দানা বেঁধেছে। ২৮৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই এলাকায় বসবাসকারী একটি পরিবারের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে যাওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সৈয়দ রেজা আলী মির্জার পুত্র এবং মুর্শিদাবাদ পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কংগ্রেস কাউন্সিলর সৈয়দ ফাহিম মির্জা এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ফাহিম মির্জা দাবি করেন, তাঁর দশম পূর্বপুরুষ ছিলেন মীর জাফর আলী খান। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই পরিবারের ভূমিকা যাই হোক না কেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক কাঠামোয় তাঁদের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফাহিম মির্জার কথায়, “আমরা এই মাটির সন্তান। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা এখানে বাস করছি। অথচ এক কলমের খোঁচায় আমাদের অস্তিত্ব ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হলো। এটি কেবল আমাদের পরিবারের জন্য নয়, মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের জন্যও এক লজ্জাজনক ঘটনা।”

প্রশাসনিক ত্রুটি নাকি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?

তৃণমূল কাউন্সিলর ফাহিম মির্জা এবং তাঁর পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। বরং এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা প্রশাসনিক গাফিলতি থাকতে পারে। বিষয়টি জানাজানি হতেই মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক মহলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। শাসক দল তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রশাসনের একাংশের অতি-সক্রিয়তা বা গাফিলতিকে দায়ী করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরও এই সুযোগে ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ছাড়ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুর্শিদাবাদে ভোটার তালিকা সংশোধন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। সেখানে নিজামত পরিবারের সদস্যদের নাম বাদ পড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাদের নথিপত্রে সামান্য ভুল রয়েছে, তারা এখন নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার হারানোর ভয়ে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন।


ঘটনার মূল তথ্যসমূহ:

  • ভুক্তভোগী: নবাব মীর জাফর আলী খানের প্রায় ৩০০ জন বংশধর।

  • উল্লেখযোগ্য নাম: ‘ছোটে নবাব’ সৈয়দ রেজা আলী মির্জা এবং কাউন্সিলর সৈয়দ ফাহিম মির্জার পরিবার।

  • স্থান: মুর্শিদাবাদ পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ড (কেল্লা নিজামত এলাকা)।

  • সময়কাল: পরিবারটি অন্তত ২৮৬ বছর ধরে ওই অঞ্চলে বসবাস করছে।

  • বিতর্কের কেন্দ্র: ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (Special Interim Revision) প্রক্রিয়া।


আগামীর পথে প্রশ্নচিহ্ন

জেলা প্রশাসন অবশ্য দাবি করেছে যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজটি নির্দিষ্ট নিয়মে করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নাম বাদ পড়লে তা পুনরুদ্ধারের আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে ফাহিম মির্জার প্রশ্ন, যাদের বংশলতিকা কয়েকশ বছরের পুরনো এবং যারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তাঁদের ক্ষেত্রে এমন ভুল কীভাবে সম্ভব?

এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ভোটাধিকারের লড়াই নয়, বরং ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য হালনাগাদ করার প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কেল্লা নিজামতের অন্দরে বইতে থাকা এই ক্ষোভের হাওয়া শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে এবং বাদ পড়া নামগুলো পুনরায় তালিকায় ফেরে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।