মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত: কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে বিশ্ব



মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার জেরে বিশ্ব নতুন করে ভয়াবহ এক জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে চরম সতর্কতা জারি করেছে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ)। সংস্থাটির প্রধান ফাতিহ বিরল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটগুলোতে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজার স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন, বিশ্ব গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো যদি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক তেল পরিবহনের একটি বিশাল অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য থমকে যাবে। এতে করে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হবে বিশ্ববাজার, যা বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদার বড় একটি অংশ।

এই বিপুল পরিমাণ তেলের ঘাটতি খুব দ্রুতই গোটা বিশ্বের সরবরাহ চেইনকে ভেঙে ফেলতে পারে। আইইএ প্রধানের মতে, অতীতের যেকোনো দুটি বড় অয়েল শকের তুলনায় এবারের ধাক্কা অনেক বেশি মারাত্মক হতে পারে। ১৯৭০-এর দশকের আরব তেল নিষেধাজ্ঞা কিংবা সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের অস্থিরতার চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতিকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রথম নেতিবাচক প্রভাবটিই পড়বে সরাসরি অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর, যা ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে এবং পরিস্থিতি খারাপ হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

তেলের এই সম্ভাব্য ঘাটতি কেবল জ্বালানি বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত হানবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন ব্যবস্থা ও কারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে তীব্র মূল্যস্ফীতি দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মারাত্মক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি যখন সবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই এমন একটি ভয়াবহ সরবরাহ ঘাটতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়াবে।

উন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে দুর্বল অর্থনীতির দেশ—সবাইকেই এই চরম মূল্য চোকাতে হতে পারে। আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে সামনেই শীতকাল ঘনিয়ে আসছে, এ সময়ে সেখানে জ্বালানি ও হিটিং অয়েলের চাহিদা এমনিতেই বাড়ে, যা বর্তমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। অপর্যাপ্ত জ্বালানির কারণে শিল্পকারখানার চাকা সচল রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অনেক দেশের পক্ষেই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলো জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য আইইএর এই সতর্কতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্য থেকেই মূলত এসব দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সিংহভাগ আসে। সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ বা ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে এই অঞ্চলের দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে।

জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে পরিবহন খরচ বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম দ্রুতই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। এ ছাড়া, বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখা সরকারের জন্য একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে তাই আগে থেকেই বিকল্প উৎস সন্ধানের কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে।