মাত্র ৮ মাসে ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় প্রবাসী আয়


মাত্র ৮ মাসে ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় প্রবাসী আয়

দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত প্রবাসী আয়ে বইছে সুবাতাস। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে যে উল্লম্ফন শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রয়েছে মার্চ মাসেও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি।


ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফেরাতে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ ঢাল হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনেই যে পরিমাণ অর্থ এসেছে, তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৪৪ শতাংশ বেশি।

রেকর্ড গড়ার পথে প্রবাসী আয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের ঠিক এই সময়ে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৮২ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে সরকারের নানামুখী উৎসাহ এবং ডলারের বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে আগ্রহী করে তুলছে।

মার্চ মাসের গতিধারা আরও বিস্ময়কর। ১ মার্চ থেকে ১১ মার্চ—এই মাত্র ১১ দিনে দেশে ১৯২ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছর এই সময়ে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ, মাসের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহ ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ১১ মার্চ একদিনেই প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা সাম্প্রতিক সময়ের দৈনিক আয়ের হিসেবে অন্যতম রেকর্ড।

কেন বাড়ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে, ফলে হুন্ডির পরিবর্তে প্রবাসীরা বৈধ পথকেই বেছে নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর থাকায় প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে তুলনামূলক বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন।

এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর সরকারি আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংকের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত বোনাস প্রদানও এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


এক নজরে রেমিট্যান্সের চালচিত্র (২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মার্চ পর্যন্ত):

  • মোট রেমিট্যান্স: ২,৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।

  • গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি: ২২.৯% (গত বছর ছিল ১,৯৮২ কোটি ডলার)।

  • মার্চের প্রথম ১১ দিনের চিত্র: ১৯২ কোটি ডলার (গত বছর ছিল ১৩৩ কোটি ডলার)।

  • একদিনের সর্বোচ্চ আয় (১১ মার্চ): ১৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার।

  • মার্চে ১১ দিনের প্রবৃদ্ধি হার: ৪৪.৩%।


অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা

রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তি। আমদানি বিল পরিশোধ এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি মেটাতে যখন ডলারের চাহিদা তুঙ্গে, তখন এই বাড়তি প্রবাহ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করছে। এর ফলে বাজারে ডলারের কৃত্রিম সংকট কাটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং টাকার মান স্থিতিশীল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।