একটি পূর্ণাঙ্গ সাস্থ্য ব্যবস্থার মূল ভিত্তি—ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট ও নার্স। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেটা কখনই পরিলক্ষিত হয়না। আর চিকিৎসা ব্যবস্থা পাচ্ছেনা তার পূর্ণতা। ডাক্তারের যেমন নির্দিষ্ট একটি পরিধি আছে তাঁরা সেই পরিধিতে কাজ করে থাকেন তেমনি নার্স বা অন্যান্য হেলথ প্রফেশনাল দেরও গণ্ডি আলাদা করা আছে। ডাক্তারের তার প্রফেশন অনুযায়ী কাজ হলো রোগ নির্ণয় এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া।
সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন ও সেবা দানের জন্য রয়েছেন বিভিন্ন রকমের ডাক্তার, যেমন_ মেডিসিন, জেনারেল ফিজিশিয়ান, অনকোলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, গাইনোকোলজিস্ট, হেপাটোলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট, ইত্যাদি।
ডাক্তারের স্পেশালিটি অনুযায়ী তাঁরা চিকিৎসা করে থাকেন। যেমন ক্যান্সারের চিকিৎসা র জন্য আপনি অনকোলজিস্ট এর কাছেই যাবেন কখনও ডেন্টিস্টের কাছে যাবেন না। আবার হার্টের সমস্যার জন্য কার্ডিওলজিস্ট এর কাছেই যেতে হবে । কারণ এখানে তাঁরা তাদের সেই বিষয়ে এক্সপার্ট। এটার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি প্রোপার প্রেসক্রিপশন। এর পরের কাজ মূলত একজন ফার্মাসিস্ট এর। ফার্মাসিস্ট সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রোগীর জন্য ওষুধ তৈরি করবেন, রোগীকে ওষুধ দেবেন এবং ওষুধের সঠিক ব্যবহার বুঝিয়ে দেবেন।
রোগীর সুবিধার জন্য ওষুধের প্যাকেটের গায়ে একটা লেবেল যুক্ত করে দেবেন, যাতে করে রোগী সঠিকভাবে এবং সহজে তার ওষুধের ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে করতে পারেন। একটি পূর্নাঙ্গ ও আদর্শ চিকিৎসা ব্যবস্থায় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ফার্মাসিস্টের কাছে সংরক্ষিত থাকবে, রোগী শুধু ওষুধের প্যাকেটের গায়ে ফার্মাসিস্টের লাগানো লেবেল অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করবেন। উন্নত বিশ্বের সব দেশেই এমন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। আর বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তার চিকিৎসা ব্যবস্থা এভাবেই সাজিয়েছে।
ফার্মাসিস্ট বললে বেশির ভাগ মানুষ চিনবেনা কারণ এই শব্দ বা প্রফেশনের মানুষের সাথে আমরা সচরাচর পরিচিত নই। ফার্মেসি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির বিষয়। ফার্মেসীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫/৬ বছর পড়া শেষ করলে তখন তাকে ফার্মাসিস্ট বলা হয় বাংলাতে যার প্রতিশব্দ হলো ওষুধবিদ।
ফিজিশিয়ান যেমন রোগ নির্ণয়, ওষুধ নির্বাচন ও প্রয়োগের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ, ঠিক তেমনি একজন ফার্মাসিস্ট ওষুধ তৈরি ও এর সঠিক, নিরাপদ ও যৌক্তিক ব্যবহারের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ।
আপাতদৃষ্টিতে ওষুধ তৈরির কাজ ছাড়া ফার্মাসিস্টের অন্য কাজগুলো সাধারণ মানুষের কাছে অত গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। তারা ভাবতে পারে, ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম, ডোজ, কিভাবে খেতে হবে সবই লিখে দিচ্ছেন, ওষুধ তৈরি করা অবস্থায় ওষুধের দোকানে পাওয়াও যায়, তাহলে প্রেসক্রিপশনের ওষুধ রোগীকে দিতে ওষুধবিদের কি দরকার?
বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজারে রোগী মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র ওষুধের সঠিক ব্যবহার না করার কারণে। প্রায় খবরে শোনা যায় এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে গেছে সেটার মূল কারণ এন্টিবায়োটিকের ভুল ব্যবহার। অনেক সময় দেখা যায় কয়েক ধরনের ওষুধ একত্রে খেতে গিয়ে একটি ওষুধের সাথে অন্য ওষুধের প্রতিক্রিয়া হয় ফলে রোগীর শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি বড় ক্ষতি বা মৃত্যু ও হতে পারে।
একজন ফার্মাসিস্ট যদি ঠিক এখানে থাকতেন যিনি ওষুধ গুলো দেখে রোগীকে তার সঠিক ব্যবহার বলে দিতেন তাহলে হয়তো ভুল ওষুধ, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা ড্রাগ-ড্রাগ ইন্টার্যাকশন এর মত বিষয় গুলো অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হত। একজন ফার্মাসিস্ট এর কাজ মূলত এখানেই। রোগীর জন্য ডাক্তার কর্তৃক প্রদত্ত ওষুধের সঠিক, নিরাপদ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
তাই পূর্নাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা অনুসরণ করে দেশে ডাক্তার ও নার্সের পাশাপাশি গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টের ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা উচিৎ ।
এক্ষেত্রে ডাক্তারদেরও উচিত দেশে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টের সেবার ক্ষেত্র তৈরিতে এগিয়ে আসা। কারণ তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আর দেশেও এখন পর্যাপ্ত গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট আছেন এবং প্রতি বছর পাবলিক প্রাইভেট মিলে প্রায় 41 টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট বের হচ্ছেন যা কয়েক হাজার।
অতিসত্বর হাসপাতাল গুলোতে চালু করতে হবে হসপিটাল ফার্মাসিস্টের পদ। তাঁরা (গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট) হাসপাতালের ওষুধ বিষয়ক সবকিছু দেখবেন এবং ওষুধের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করবেন। ‘ফার্মাসিস্ট’ পদবি ব্যবহারের বর্তমান নীতিমালাও সংশোধন করতে হবে। যারা ব্যাচেলর অব ফার্মেসি (বি.ফার্ম) ডিগ্রি অর্জন করেছেন, শুধুমাত্র তাঁদের ছাড়া আর কাউকে এ পদবি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশে তিন বছরের ডিপ্লোমা ইন ফার্মেসি কোর্স সম্পন্নকারীদের ‘বি’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট ও তিন মাসের সার্টিফিকেট ইন ফার্মেসি কোর্স সম্পন্নকারীদের ‘সি’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট বলার যে বিধান রয়েছে এটি অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর ।
এটি দ্রুত পরিবর্তন সাপেক্ষে যারা তিন বছরের ডিপ্লোমা ইন ফার্মেসি করবেন তাদের ফার্মেসি টেকনিশিয়ান এবং তিন মাসের কোর্স কারি দের বিক্রয়কর্মী হিসেবে আলাদাভাবে সার্টিফিকেট দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
এক স্পেশালিটির ডাক্তারের যেমন অন্য স্পেশালিটির রোগীর ট্রিটমেন্ট উচিৎ নয় তেমনি ওষুধের সঠিক, নিরাপদ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব একজন গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টকেই দেয়া উচিৎ। সেক্ষেত্রে একজন দক্ষ ও যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বি.ফার্ম বা এম.ফার্ম ডিগ্রিধারী গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্টই পারেন ওষুধের সঠিক ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে। আর এভাবেই একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্ভব । এতে করে বেনিফিটেড হবেন সবাই বিশেষ করে সাধারণ মানুষ।

