যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে নতুন বার্তা দিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনকে আগে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপ করা নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে এবং দেশটির উত্থাপিত দাবিগুলো মেনে নিতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নৌ চলাচলের পথ খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
সোমবার (২ নভেম্বর) তেহরানে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি এ অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বৈধ দাবিগুলো মেনে নিলে দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর পথও তৈরি হবে।
বাঘায়ি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো তেহরানের সাত দিনের প্রস্তাব এখনও আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সদিচ্ছার পরিচয় দিতে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সময়সীমা কমিয়ে দুই দিন করার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের দাবিগুলো পূরণ না হলে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং তেহরানের শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না নিলে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগও এগোবে না।
চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে সাত দফার পরিকল্পনাটি গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠায় ইরান। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবটি নিয়ে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সামরিক উত্তেজনা কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আগের যুদ্ধের তুলনায় পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
রোববার ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে সেটি আগের সংঘাতের চেয়েও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। যুদ্ধ কখন শেষ হবে কিংবা কী শর্তে শেষ হবে, তা এককভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ মার্কিন প্রেসিডেন্টের থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথা বলার পর তেহরানের পক্ষ থেকে এই সতর্কবার্তা আসে।
গত ৩১ অক্টোবর ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের জন্য এখনও এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তু বাকি রয়েছে। সেগুলোতে হামলা চালাতে মাত্র ১০ মিনিট সময় লাগতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নাম উল্লেখ করেন ট্রাম্প। পরদিন ১ নভেম্বর আইওয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশেও ওই স্থাপনায় হামলার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ইরান ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, গত ৩১ অক্টোবর টেলিফোনে কথা বলার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে নতুন হামলা চালানোর বিষয়ে চাপ দেন।
তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প আপাতত কূটনৈতিক আলোচনার জন্য আরও কিছুটা সময় দিতে আগ্রহী ছিলেন।
এর মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলা নিয়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন গত রোববার গভীর রাতে দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার সিদ্ধান্ত কয়েক দিনের মধ্যেই নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।
কার্লসনের অভিযোগ, মধ্য ইরানের একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দিতে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কূটনৈতিক আলোচনা, সামরিক হুমকি এবং পারমাণবিক স্থাপনা ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

