বিগত ২৪ বছর ধরে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার দিগরাজ গ্রামে মৎস্যঘেরের দুই পাহারাদারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দুই মামলার বিচার ঝুলে আছে।
এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি একই ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা এবং তার তদন্ত বেআইনি। কিন্তু এই কাজটিই পুলিশ করছে। আরও জানা যায় যে, মামলা দুটি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে উঠেছে। কিন্তু দ্বিতীয় মামলাটি বিচারের জন্য আদালতে ওঠায় প্রথম মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে যায়। পরবর্তীতে আবার হাইকোর্টের আদেশে দ্বিতীয় মামলাটিও স্থগিত হয়ে গেছে।
জানা যায়, ১৯৯৪ সালে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার দিগরাজ গ্রামে মৎস্যঘেরের দুই পাহারাদারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এই মামলা হয় । তবে, এই মামলার অন্যতম সমস্যা, প্রথম মামলায় যারা বাদী ছিলেন, দ্বিতীয় মামলায় তারাই আবার আসামি হিসেবে আছেন।
কিন্তু বাদী অথবা বিবাদী যারাই আসল দোষী হোক না কেন, মামলাটিতে উভয়পক্ষই চরম হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে জানা যায়।
এলাকাবাসী জানায়, ১৯৯৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাগেরহাট জেলার মোংলা বিদ্যারবাহন দিগরাজ গ্রামের একটি মৎস্যঘেরের কক্ষে খুন হন কামরুল ইসলাম ও আবদুর রশিদ নামের দুই পাহারাদার। মাছের ঘেরসংক্রান্ত বিরোধের কারণে বিরোধী পক্ষের সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুলি করে তাদের হত্যা করে।
একটি মামলা থেকে জানা যায়, বাগেরহাটের রামপাল থানার শ্রীফলতলা গ্রামের গোলাম আজমের বড় ভাই গোলাম মাওলা (কাকন) ওই ঘেরে মাছ চাষ করে আসছিলেন। এলাকার অন্য একটি মহল জমির মালিকদের কাছ থেকে ঘের লিজ নিতে না পেরে বারবার ওই ঘেরের ক্ষতি করার চেষ্টা করছিল। তাই তারা রাতের বেলা ওই ঘেরে হামলা চালায়।
পাহারাদার দুজন খুন হওয়ার পর ঘেরের মালিকের ভাই গোলাম আজম বাদী হয়ে ১৯৯৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোংলা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নম্বর ৪/১১.০৯.৯৪)। মামলায় আসামি করা হয় দিগরাজ গ্রামের আরজ আলী ডাকুয়া, হেমায়েত ডাকুয়া, পিন্টু রায়, বাবুল শেখ, মান্নান সরদার, বিদ্যারবাহন গ্রামের নসরুদ্দীন ফকির, বুড়িডাঙ্গা গ্রামের কৃষ্ণপদ রায় ও দিপক রায়কে।
অন্যদিকে ২০ সেপ্টেম্বর নিহত পাহারাদার কামরুল ইসলামের ভাই মো. সফরুল শেখ বাদী হয়ে একই থানায় আরেকটি হত্যা মামলা (নম্বর-৮, তারিখ ২০.০৯.১৯) দায়ের করেন। এই মামলায় প্রথম মামলার বাদী গোলাম আজম, বাদীর ভাই ও ঘের মালিক গোলাম মাওলা (কাকন), রামপাল থানার বাশতলা গ্রামের আ. ছালাম, আবুল কালাম, আবু সাঈদ শেখ, হাইজার শেখ, মোহাম্মদ আলী শেখ ও সোলায়মান শেখ এবং সোনাইলতলা গ্রামের ইউনুস সরদার, হুমাউন সরদার, মহসিন সরদার ও হোগলাডাঙ্গা গ্রামের ইউনুস মল্লিককে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকেও আসামি করা হয়। এই এজাহারে বলা হয়, প্রথম মামলার বাদী বা ঘের মালিক তাঁদের শত্রুপক্ষদের ঘায়েল করার জন্য নিজেরা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে ঘের পাহারাদার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ না করেই মামলা করেছেন।
একই ঘটনায় দুটি মামলা মোংলা থানা প্রথমে তদন্ত করে। পরে সিআইডি তদন্ত করে। প্রথম মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আরজ আলী ডাকুয়া, হেমায়েত ডাকুয়াসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ১৯৯৮ সালের ৭ নভেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরে মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় বাগেরহাট অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। ওই আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়া শেষ হওয়ার পর বর্তমানে যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
দ্বিতীয় মামলার তদন্তও চলতে থাকে। সিআইডি তদন্ত করে দুই দফায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম মামলার আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিহত কামরুল ইসলামের ভাই ঘের মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তার অভিযোগের সপক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বাগেরহাটের তৎকালীন দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট দাউদ খান বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ২০০৫ সালের ২৫ জুন প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় মামলার আসামি তথা ঘের মালিকদের পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়।
মামলাটি বিচারের জন্য বাগেরহাট অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই আদালতেই এখন দুটি মামলা বিচারাধীন। প্রথম মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এটি যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য ছিল। এখন দ্বিতীয় মামলা বিচারের জন্য একই আদালতে স্থানান্তরের জন্য পাঠানোয় প্রথম মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি হচ্ছে না। আবার দ্বিতীয় মামলাটিও হাইকোর্টের নির্দেশে ছয় মাসের জন্য স্থগিত আছে।
ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. বোরহান বলেন , একই ঘটনায় দুটি মামলা ভিন্ন ব্যক্তি দায়ের করতে পারেন। কিন্তু প্রথম যে মামলা রুজু হবে, দ্বিতীয়টি সেটির সঙ্গে যুক্ত হবে। অর্থাৎ একই সঙ্গে তদন্ত হবে। পৃথক তদন্তের কোনো সুযোগ নেই। থানা ভিন্নভাবে মামলা রুজু করতে পারে না। তিনি বলেন, একসঙ্গে তদন্ত হলে ২৪ বছর ধরে একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার ঝুলে থাকত না। এখন যে প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে সেটিতে প্রকৃত হত্যাকারী কে তা প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
এছাড়াও, দ্বিতীয় মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি হিসেবে প্রথম মামলার সঙ্গে যুক্তের বিষয়ে পুলিশ দুটি মামলা রুজু করে বেআইনি কাজ করেছে।
তবে, আইনজীবীরা বলছেন পুলিশের যথাযথ সিদ্ধান্ত এবং অনীহার কারনেই এখন পর্যন্ত কামরুল ও রশিদ হত্যার বিচার সম্পূর্ণ হচ্ছে না।

