অমর একুশ মানেই মাথা নত না করা, একুশ মানেই রক্ত দিয়ে কেনা বর্ণমালা। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে আজ শনিবার সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অভিমুখে মানুষের ঢল নেমেছে। ভোরের শিশিরভেজা আল্পনা মাড়িয়ে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা বেলা গড়িয়ে দুপুর হলেও বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয়নি। বরং সময়ের সাথে সাথে মানুষের উপস্থিতি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।
একুশের চেতনায় সিক্ত রাজধানী
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও এর আশপাশের এলাকাগুলো লোকে লোকারণ্য। পলাশী মোড় থেকে শুরু করে জগন্নাথ হলের মোড় হয়ে শহীদ মিনার পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন আবালবৃদ্ধবনিতা। হাতে সযত্নে ধরা গাঁদা, গোলাপ আর রজনীগন্ধার স্তবক। অনেকের পরনে কালো ব্যাজ, অনেকের পরনে শোকের আবহে সাদা-কালো পোশাক।
বাতাসে ভাসছে সেই কালজয়ী সুর—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। সম্মিলিত কণ্ঠে এই গান গেয়ে তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে প্রবীণরা ভাষা আন্দোলনের সেই বীর শহীদদের স্মরণ করছেন। স্তব্ধ দুপুরে এই সমবেত কণ্ঠস্বর যেন বায়ান্নর সেই উত্তাল রাজপথকেই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি
শহীদ মিনারের মূল বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ ব্যানার নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। হাতে হাত ধরে, শৃঙ্খলার সাথে তারা এগিয়ে আসছেন বেদির দিকে।
ছোট্ট শিশুদের নিয়ে আসা অনেক অভিভাবক জানান, সন্তানকে ভাষার ইতিহাস জানানো এবং শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শেখাতেই তারা এখানে এসেছেন। কেবল রাজধানী নয়, দেশের দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এসেছেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে।
রক্তের ঋণ শোধের অঙ্গীকার
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা যেন আজ বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পদযাত্রা চলাকালীন অনেক তরুণকে দেখা গেছে ডিজিটাল ব্যানার নয়, বরং হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসতে। যেখানে লেখা— ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন হোক’ কিংবা ‘রক্তে কেনা বর্ণমালা, বৃথা যেতে দেব না’।
বিশ্লেষকদের মতে, একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সনদ। প্রতি বছর শহীদ মিনারে এই জনস্রোত প্রমাণ করে যে, নতুন প্রজন্মের কাছেও ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি।
দুপুর দেড়টা পর্যন্তও শহীদ মিনার এলাকায় মানুষের দীর্ঘ লাইন শেষ হয়নি। বিকেলের দিকে এই ভিড় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যতক্ষণ মানুষের উপস্থিতি থাকবে, ততক্ষণ শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ বজায় রাখা হবে। আজকের এই জনসমুদ্র কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং প্রাত্যহিক জীবনে মাতৃভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার এক নতুন শপথ।

