চন্দ্রবিজয়ের অর্ধশতাব্দী পর পৃথিবী থেকে ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে কেবল পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে আসাই এখন আর মূল লক্ষ্য নয়। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবার চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসতি গড়ার এক উচ্চাভিলাষী ও বৈপ্লবিক মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। শুক্রবার ‘ইগনিশন’ নামক এক বিশেষ অনুষ্ঠানে সংস্থাটি জানিয়েছে, এখন থেকে লক্ষ্য কেবল সফর নয়, বরং চাঁদে নিয়মিত যাতায়াত ও অবস্থান নিশ্চিত করা।
ট্রাম্পের মহাকাশ নীতি ও নাসার নতুন গতি
নাসার এই নতুন মিশন মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। হোয়াইট হাউসের লক্ষ্য হলো মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বজায় রাখা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে থাকা নাসার নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নিজের সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, নাসা আবারও ‘অসম্ভবকে সম্ভব’ করার পথে হাঁটছে।
আইজ্যাকম্যান জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং সেখানে একটি স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শেষ করতে চায় নাসা। তিনি এক নাটকীয় সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “মহাকাশ গবেষণার এই প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয় এখন আর বছরের হিসাবে নয়, বরং মাসের হিসাবে গণনা করা হবে।” এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, চীন বা অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় নাসা এখন সময়ের লড়াইয়ে অনেক বেশি মরিয়া।
আর্টেমিস ৩: নতুন যুগের সূচনা
নাসার এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে তাদের বহুল আলোচিত ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রাম। পরিকল্পনার প্রথম বড় মাইলফলক হিসেবে ধরা হচ্ছে ‘আর্টেমিস ৩’ মিশনকে। ২০২৭ সালে এই মিশনের মাধ্যমেই কয়েক দশক পর আবারও চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন নভোচারীরা। তবে এবারের বিশেষত্ব হলো স্থায়িত্ব।
আগের অ্যাপোলো মিশনগুলোর মতো দীর্ঘ বিরতি দিয়ে বিশাল প্রজেক্ট করার বদলে নাসা এখন ‘ঘন ঘন এবং সাশ্রয়ী’ অভিযানের মডেল বেছে নিয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য ল্যান্ডিং প্রযুক্তি বা ‘রিইউজেবল টেকনোলজি’ ব্যবহার করে প্রতি ছয় মাস অন্তর নিয়মিতভাবে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। এর উদ্দেশ্য হলো চাঁদে একটি কার্যকর লজিস্টিক চেইন তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহ বা মহাকাশের আরও গভীরে যাওয়ার জন্য ‘বেস ক্যাম্প’ হিসেবে কাজ করবে।
অভিযানের প্রধান মাইলফলক ও তথ্যসমূহ:
মিশন ২০২৭: আর্টেমিস ৩-এর মাধ্যমে চাঁদে নভোচারী পাঠানো এবং ল্যান্ডিং।
স্থায়ী ঘাঁটি: লুনার গেটওয়ে এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে স্থায়ী বসতি স্থাপনের উদ্যোগ।
নিয়মিত ফ্লাইট: প্রতি ছয় মাস অন্তর নতুন দল বা রসদ পাঠানোর পরিকল্পনা।
প্রযুক্তির অগ্রাধিকার: খরচে লাগাম টানতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ল্যান্ডিং ক্রাফটের ব্যবহার।
কৌশলগত লক্ষ্য: মহাকাশ গবেষণার গভীর স্তরে পৌঁছাতে চাঁদকে ‘লঞ্চপ্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করা।
চ্যালেঞ্জ ও ভূ-রাজনীতি
চাঁদে বসতি গড়ার এই পরিকল্পনা কেবল বিজ্ঞানের জয়গান নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। চাঁদের খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থান দখল করতে মরিয়া বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো। নাসার এই দ্রুত পদক্ষেপ মূলত রাশিয়ার মহাকাশ স্থবিরতা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রাকে টেক্কা দেওয়ার একটি কৌশল। তবে এই স্বল্প সময়ের মধ্যে স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণ এবং নভোচারীদের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নাসার জন্য এক বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

