ছয় লাখ বাংলাদেশি এখন ‘আধুনিক দাস’



মানব সমাজে প্রচলিত সবচেয়ে বর্বর , নির্মম ও নিষ্ঠুর প্রথার মধ্যে দাসপ্রথা ছিল সবার ওপরে। এই একবিংশ শতাব্দীতে বসে কল্পনাও করা যাবে না সেই দাস প্রথা কতটা অমানবিক ও ভয়াবহ ছিল। কালের বিবর্তনে পৃথিবীর বুক থেকে বিলুপ্ত হয়েছে দাসপ্রথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কি সমাপ্তি ঘটেছে এই প্রথার?
এখনো রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া কারণে অথবা কোনো না কোনোভাবে কিছু মানুষ নামমাত্র মজুরিতে দাসের মতো শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন, দালালের খপ্পরে পড়ে বাধ্য হচ্ছেন যৌনকর্মীর জীবন যাপনে, অথবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করে কাটাচ্ছেন কৃতদাসীর জীবন। বিশ্বের চার কোটির বেশি মানুষ এই দাসত্বের শিকার।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সংস্থা ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন তাদের এই দুর্দশাকে বর্ণনা করেছে ‘আধুনিক দাসত্ব’ হিসেবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স-২০১৮ বলছে, বাংলাদেশে প্রতি হাজারে ৩.৬৭ জন মানুষ কোনো না কোনোভাবে ‘আধুনিক দাসত্ব’ শিকার হচ্ছেন। ষোল কোটি মানুষের এই দেশে এ ধরনের দুর্দশায় পড়া মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ ৯২ হাজার।
জনসংখ্যার আনুপাতিক হিসাবে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ৯২তম।
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে যারা ‘আধুনিক দাসের’ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের অধিকাংশের বসবাস এশিয়ায়। এ মহাদেশের ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ আধুনিক দাসত্বের শিকার, যা এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ।
মোট সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি আধুনিক দাসের বসবাস চীন, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ায়; এই সংখ্যা বিশ্বে আধুনিক দাসের মোট সংখ্যার ৬০ শতাংশ।
প্রতি হাজারে এ ধরনের দুর্দশায় শিকার মানুষের হার বিবেচনা করলে এবারের সূচকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। সেখানে প্রতি হাজারে ১০৪. ৬ জন আধুনিক দাসত্বের শিকার।
এই তালিকার শীর্ষ দশে উত্তর কোরিয়ার পরে ধারাবাহিকভাবে এসেছে ইরিত্রিয়া, বুরুন্ডি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, আফগানিস্তান, মৌরিতানিয়া, সাউথ সুদান, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইরান।
আধুনিক দাসত্বের এই প্রচ্ছন্ন অপরাধ থেকে মুক্ত নয় উন্নত বিশ্বও। যুক্তরাষ্ট্রে ৪ লাখ, যুক্তরাজ্যের ১ লাখ ৩৬ হাজার,     জার্মানির ১ লাখ ৬৭ হাজার, ফ্রান্সের ১ লাখ ২৯ হাজার মানুষ দাসের মত জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে বলে উঠে এসেছে এবারের প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে প্রতি হাজারে ২২.২ জন, পাকিস্তানে হাজারে ১৬.৮ জন, মিয়ানমারে ১১ জন, ভারতে ৬.১ জন, নেপালে ৬ জন এবং শ্রীলঙ্কায় ২.১ জন আধুনিক দাসত্বের শিকার।
এই দাসত্বের অবসানে সরকারের পদক্ষেপ ও তাতে সাফল্যের বিবেচনায় সূচকে বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে ‘বি’ রেটিং।
এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ সরকার এ সমস্যায় সাড়া দিতে উদ্যোগী হয়েছে এবং কিছু মানুষকে সহায়তাও দিতে পারছে। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় এমন কাঠামো যুক্ত করতে পেরেছে, যাতে কাউকে দাসের জীবনে বাধ্য করা হলে দোষী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা যায়।