নার্সিসাস বা নার্সিসিসি একটি ডেফোডিল জাতীয় ফুলের নাম। গ্রীক পুরাণ অনুসারে এই ফুলের জন্ম নার্সিসাস নামের একজন অপূর্ব সুন্দর যুবকের দেহ থেকে। এই যুবকের কাহিনীর সাথে মিলে যাওয়া আচরণের নাম নার্সিজম বা আত্ম-প্রেম বা নিজের সাথে প্রেম।
নার্সিসাসের পিতা নদীর দেবতা সিফিসাস এবং মাতা লিরিউপি নামক একজন পরী। নার্সিসাসের জন্মের পর তাঁর মা তাঁকে নিয়ে গেলেন এক অন্ধ ভবিষ্যৎ-বক্তার কাছে ছেলের আয়ুষ্কালের ব্যাপারে জানতে। ভবিষ্যৎ-বক্তার নাম ছিল টাইরেসিয়াস। এখানে টাইরেসিয়াসের অন্ধ হওয়ার গল্পটা একটু বলে দেই। আগে তিনি অন্ধও ছিলেন না এমন কি ভবিষ্যৎ-বক্তাও ছিলেন না।
যাইহোক, নার্সিসাসের মা লিরিউপি তাঁকে নিয়ে এই অন্ধ টাইরেসিয়াসের কাছে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার ছেলে কতদিন বাঁচবে?’
টাইরেসিয়াস বললেন, ‘এই ছেলে একটা লম্বা জীবন পাবে কেবল যদি সে নিজেকে কখনো না দেখে।’
নার্সিসাস ছিলো অসামান্য সুন্দর একটা ছেলে। জলপরীরা, বনপরীরা, ঝর্নাপরীরা, সুন্দরী মেয়েরা, এমন কি ছেলেরা তাঁর প্রেমে পরতো অহরহ। কিন্তু সে কাউকেই পাত্তা দিতো না। সবাইকে সে বলতো, ‘তুমি আমার যোগ্য নও’।
একবার এমিনিয়াস নামক এক যুবক নার্সিসাসের প্রেমে মজেছিলো ভীষণ রকম। এই এমিনিয়াস তার আরো পুরুষ অনুরাগীদেরকে ইতোমধ্যে ফিরিয়ে দিয়েছে শুধুমাত্র নার্সিসাসকে পাওয়ার জন্য। কিন্তু নার্সিসাস ফিরিয়ে দিলো তাকে এবং একটা ছুরি উপহার দিলো। এর পেছনে নিশ্চয়ই গোপন কোন ইচ্ছা ছিলো! নার্সিসাসের গোপন ইচ্ছাও পূরণ হলো সেদিন, যেদিন এমিনিয়াস সেই ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করলো নার্সিসাসেরই দরজার সামনে।
নার্সিসাসের প্রতি চরম অনুরক্ত একজন বনপরী হলো ইকো। ইকো মানে হলো প্রতিধ্বনি। ইকো কথা বলতে পারতো না। শুধু অন্যের কথার প্রতিধ্বনি করতে পারতো। তাঁর এই অবস্থাও করেছেন জিউসের স্ত্রী হেরা। জিউস মাঝে মধ্যে বিভিন্ন পরীর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য অলিম্পাস পর্বত থেকে চলে আসতেন। তাঁদের অমতেও তিনি জোর করে হলেও মিলিত হতেন। হেরাও তাঁর স্বামীকে ও যৌনসঙ্গী পরীকে হাতেনাতে ধরার জন্য অলিম্পাস থেকে একবার চলে এলেন। সেই সময় ইকো তাঁর দীর্ঘ ও চমৎকার গল্প বলে হেরাকে ভুলিয়ে রাখলো। এই ফাঁকে জিউস চম্পট দিতে পারলো। হেরার সন্দেহ হলো যে, ইকো তাঁর সাথে ফাঁকিবাজি করেছে। তাই তিনি বাচাল ইকোর কন্ঠস্বর কেড়ে নিলেন। তাঁকে অভিশাপ দিলেন যেন সে কখনো নিজে থেকে কথা বলতে না পারে। বোকার মতো মানুষের কথার প্রতিধ্বনি করতে পারবে শুধু।
তো নার্সিসাস বনে যেত শিকার করার জন্য। বনপরী ইকোও তাঁর অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকত। ভাবতো হয়তো একবার হলেও নার্সিসাস তাঁর দিকে তাকাবে। তার কতো আশা নার্সিসাসকে বলবে সে কে এবং তার হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা শুধুই নার্সিসাসের জন্য রাখা। কিন্তু হায়! সে নিজে থেকে কথা বলতে পারেনা। সে ছুটে গেলো নার্সিসাসের দিকে এবং নিজেকে ছুঁড়ে দিলো ওর বুকে।
নার্সিসাস খুব রেগে গেলো। সে ইকোকে মাটিতে ফেলে দিলো। ছোট ছোট গাছ গুলো ভেঙে গেলো ইকোর শরীরের চাপে। তার হৃদয় ভেঙে গেলো। লজ্জায় অপমানে সে দৌড়ে চলে গেলো পর্বতের দিকে। আক্ষেপ করতে করতে একসময় সে মরে গেলো। পর্বতের পাথরের সাথে তার শরীরও লীন হয়ে গেলো। শুধু রয়ে গেলো তার কন্ঠস্বর, যা অন্যের উচ্চারিত শব্দকে অনুকরণ করে।
নার্সিসাস একইভাবে আরো অসংখ্য পরীকে আকৃষ্ট করলো তাঁর প্রেমিক-প্রেমিক আচরণ দিয়ে। কিন্তু শেষে তাদেরকে তাচ্ছিল্যের সাথে দূরে সরিয়ে দিতো। এভাবে অপমানিত হয়ে তারা মন থেকে চাইত যে, ভালোবেসেও ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট কেমন তা নার্সিসাস একবার বুঝুক।
এমন প্রত্যাখাতদের মধ্যে একজন একবার প্রতিশোধের দেবী নেমেসিসের কাছে প্রার্থনা করলো, ‘হে দেবী নেমেসিস, নার্সিসাস যদি কখনো প্রেমে পরেও, সে যেন ভালোবাসা না পায়।’ নেমেসিস প্রার্থনা শুনেছিলেন এবং নার্সিসাসের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেললেন।
একদিন অনেক রৌদ্রের সময় নার্সিসাস একটা জলাশয়ের ধারে এলো। সে যখনি জলের দিকে তাকালো, দেখলো এক অপূর্ব জলদেবতা জল থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারেনি যে ওই প্রতিবিম্ব তাঁরই এবং সাথে সাথেই সে তাঁর প্রতিবিম্বের প্রেমে পরে গেলো। নার্সিসাস নিচু হয়ে প্রতিবিম্বকে চুমো খেতে গেলো। ওই প্রতিবিম্বও তাঁকে একইভাবে চুমো খেতে এলো। এটাকে পারস্পরিক সম্মতি মনে করে নার্সিসাস তাঁর প্রতিবিম্বকে জল থেকে টেনে তোলার জন্য হাত বাড়ালো। জলে ঢেউ উঠতেই সেই অপূর্ব জলদেবতা চলে গেলো। সে অস্থির হয়ে গেলো।
কোথায় চলে গেলো তাঁর ভালোবাসার মানুষ? যখন জল আবার স্থির হয়ে এলো, জলদেবতাও ফিরে এলো। নার্সিসাস তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কেনো? হে সুন্দর, কেনো তুমি আমার কাছে থেকে দূরে থাকো, কেনো আমাকে এড়িয়ে যাও? আমার চেহারা নিশ্চয়ই তোমাকে চলে যেতে বাধ্য করে না! পরীরা আমাকে ভালোবাসে। আমাকে পাওয়ার জন্য তারা ব্যাকুল। তোমাকেও আমার প্রতি বিরক্ত দেখা যাচ্ছে না। যখন আমি আমার বাহু বাড়িয়ে দেই, তুমিও তাই করো। তুমি আমাকে দেখে হাসো এবং আমার মতো তুমিও মাথা নেড়ে সায় দাও।’
আবার হাত বাড়ালো নার্সিসাস। জলদেবতাও আবার চলে গেলো। জল ছুঁলেই জলদেবতা অদৃশ্য হয়ে যায়, এতে নার্সিসাস খুব ভয় পেয়ে গেলো। সে আর জলের দিকে হাত বাড়ালো না। একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো তাঁর প্রতিবিম্বের প্রতি।
হতাশায় নার্সিসাস শুধু কাঁদত। যেহেতু সে কাঁদত, ইকোও তাঁর সাথে কাঁদত। সে নড়াচড়া করতো না, খেতো না, কোন কিছু পান করতো না। শুধু হতাশায় নিমজ্জিত হতে থাকলো। অলীক প্রেমিকের শোকে তাঁর শরীর শুকিয়ে যেতে থাকলো, তাঁর সৌন্দর্য ম্লান হতে থাকলো। যেসকল পরীরা তাঁকে ভালোবাসতো তারা বারবার তাঁকে অনুরোধ করলো সেই জলাধারের কাছ থেকে সরে আসতে। ইকোও তাঁদের সাথে সাথে অনুরোধ করলো।
কিন্তু নার্সিসাস যেনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো অটল রইলো। চিরদিনের মতো সে জলাধারের পাশেই বসে থাকার ইচ্ছা দেখালো। এভাবে ভুগতে ভুগতে একসময় ইকোর মতো নার্সিসাসও মরে গেলো। ধীরে ধীরে তাঁর শরীরও অদৃশ্য হয়ে গেলো। পরীরা শোকে বিলাপ করতে থাকলো। যেহেতু পরীরা বিলাপ করতে থাকলো, ইকোও তাঁদের সাথে বিলাপ করতে থাকলো। আর মাটিতে মিশে যাওয়া নার্সিসাসের শরীর থেকে জন্ম নিলো নার্সিসাস ফুল।

