পাম্পে তেল বিক্রিতে কড়া নিয়ন্ত্রণারোপ বিপিসির


পাম্পে তেল বিক্রিতে কড়া নিয়ন্ত্রণারোপ বিপিসির

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসেছে সরকার। দেশে সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলা ও সাধারণ মানুষের ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত কেনাকাটা রুখতে আজ শুক্রবার থেকে পাম্পে তেল বিক্রিতে কঠোর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।


বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাব ও স্থানীয় অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ কেবল ওই অঞ্চলের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর আঁচ এসে লেগেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও অনুভূত হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ভয়ে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল মজুদ করার চেষ্টা করছেন, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আজ এক জরুরি নির্দেশনায় বিপিসি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এখন থেকে কোনো যানবাহনই ইচ্ছেমতো জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবে না। মূলত মজুত টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরাতেই এই ‘রেশনিং’ বা সীমিতকরণের পথে হাঁটল সরকার।

পাম্পে কার জন্য কতটুকু তেল?

বিপিসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যানবাহনের ধরণ ভেদে তেলের পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেল চালকরা এখন থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবেন। ব্যক্তিগত ছোট গাড়ির (কার) ক্ষেত্রে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লিটার।

অন্যদিকে, বড় গাড়ি যেমন স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) বা জিপ এবং মাইক্রোবাসের জন্য দৈনিক বরাদ্দ ২০ থেকে ২৫ লিটার। গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানের চাকা সচল রাখতে কিছুটা শিথিলতা রাখা হলেও সেখানেও রয়েছে সীমা। লোকাল বাস বা পিকআপ ভ্যান দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। তবে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক বা কনটেইনারবাহী লরির মতো ভারী যানবাহনের জন্য এই সীমা সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত।

বিপিসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সীমাবদ্ধতা সাময়িক। তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে পুনরায় আগের নিয়মে ফিরে যাওয়া হবে। তবে নির্দেশ অমান্য করে কোনো পাম্প অতিরিক্ত তেল বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।


এক নজরে জ্বালানি সরবরাহের নতুন সীমা:

  • মোটরসাইকেল: সর্বোচ্চ ২ লিটার (দৈনিক)।

  • ব্যক্তিগত গাড়ি (কার): সর্বোচ্চ ১০ লিটার।

  • জিপ ও মাইক্রোবাস: ২০ থেকে ২৫ লিটার।

  • লোকাল বাস ও পিকআপ: ৭০ থেকে ৮০ লিটার।

  • দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক: ২০০ থেকে ২২০ লিটার।

  • কারণ: বিশ্ববাজারে সরবরাহ ঘাটতি ও স্থানীয়ভাবে আতঙ্কিত কেনাকাটা রোধ।


অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা ও নাগরিক প্রতিক্রিয়া

হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ চালক ও পরিবহন মালিকরা। বিশেষ করে যারা অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং করেন, তাদের জন্য ২ লিটার তেল দিয়ে সারাদিন গাড়ি চালানো প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, পণ্যবাহী ট্রাকের তেল সীমিত করায় নিত্যপণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের এই নিয়ন্ত্রণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে উৎপাদন ও পরিবহন খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকার অবশ্য আশ্বস্ত করছে যে, পর্যাপ্ত মজুত এখনো আছে এবং কেবল অপ্রয়োজনীয় অপচয় রোধেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।