বাংলাদেশে শবে বরাতে হালুয়া-রুটি যেভাবে এলো


paperslife

সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য অত্যন্ত মহিমান্বিত রাত শবে বরাত। এই রাতে আল্লাহ মানবজাতির জন্য তাঁর অসীম রহমতের দরজা খুলে দেন। ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করার সুযোগ ঘটে এই পবিত্র রাতে। বছর ঘুরে এই পবিত্র রাত আসে সৌভাগ্যের বার্তা নিয়ে।

শবে বরাতের বহুল প্রচলিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে, বাড়িতে হালুয়া-রুটি তৈরি এবং প্রতিবেশীদের মাঝে সেটি বিতরণ। এই দিনটি আসলেই অবধারিতভাবে হালুয়া-রুটি তৈরির বিষয়টি চলে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হালুয়া-রুটি তৈরির এ সংস্কৃতি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে কিভাবে চালু হয়েছে?

শবে বরাতের সঙ্গে হালুয়া-রুটির একটি প্রচলন পরিলক্ষিত হয়। হালুয়া আরবি শব্দ, অর্থ হলো মিষ্টি বা মিষ্টান্ন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিষ্টি পছন্দ করতেন, এ কথা সুবিদিত; তিনি গোশতও পছন্দ করতেন, তা-ও অবিদিত নয়। যাই হোক, শবে বরাত হলো ইবাদতের রাত। দান-খয়রাত করা ও মানুষকে খাওয়ানো একপ্রকার ইবাদত।

ইসলামের ইতিহাস যারা বিশ্লেষণ করেন, তাদের অনেকেই মনে করেন যে বাংলাদেশের সমাজ বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর অংশ।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অধ্যাপক বলেন, এয়োদশ শতাব্দীতে ভারতের দিল্লীতে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে আসে। সে সময় তৎকালীন বাংলাদেশ ভূ-খন্ডেও ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব হয়।

তিনি বলেন, “রসুলউল্লাহ সা: সাহাবাদের যুগেও এ উপমহাদেশে তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা সুদূর আরব থেকে ইসলাম যে বিভিন্ন দেশে এসেছে, এগুলোর সাথে কিছু-কিছু দেশজ উপাদান যুক্ত হয়েছে। আমরা জানি যে রসুলউল্লাহ সা: মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। তাঁর পছন্দের জিনিসকে উম্মতরা পছন্দ করবে সেটাও তাকে পছন্দ করার একটি ধরন। ফলে মিষ্টির একটা জনপ্রিয়তা মুসলিম সমাজে আছে।”

তিনি মনে করেন, শবে বরাতের সময় হালুয়া-রুটি বানানো এবং বিতরণ করার সাথে আনন্দ ভাগ করে নেবার একটি সম্পর্ক আছে।

তিনি বলেন, “আনন্দের ভাগটা অন্যদের দেয়ার জন্যই বিতরণ করার রেওয়াজটা হয়েছে। এর সাথে ধর্মীয় অনুভূতি এবং সামাজিকতা রক্ষা- দুটো বিষয় জড়িত আছে,”

বাংলাদেশ ভূ-খন্ডে শবে বরাত পালনের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় ১৯’শ শতকের শেষের দিকে। তখন ঢাকার নবাবরা বেশ ঘটা করেই শব-ই-বরাত পালন করতেন বলে জানিয়েছে ইতিহাসবিদরা। সে সময়ে ঢাকার নবাবরা শব-ই-বরাতের সময় আলোকসজ্জা করতো । এরপর পাশপাশি মিষ্টি বিতরণ করতো।

ইতিহাসবিদদের মতে সে সময়ে যেহেতু মিষ্টির দোকান খুব একটা প্রচলিত ছিলনা, সেজন্য মিষ্টি জাতীয় খাদ্য বানানোর উপাদান দিয়ে বাড়িতে হালুয়া তৈরির প্রচলন শুরু হয়। ধীরে-ধীরে এর বিস্তার ঘটতে থাকে। নবাবরা যেহেতু মুসলিম ছিলেন এবং ঢাকাকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেজন্য উৎসবগুলোকে তারা গুরুত্ব দিতেন। এর মাধ্যমে নবাবদের আধিপত্য, মুসলমানদের আধিপত্য এবং ধর্ম পালন এই তিনটি বিষয় একসাথে প্রকাশ হতো।

১৯’শ শতকের শেষের দিকে ঢাকায় শব-ই-বরাত পালন মুসলিম পরিচয় প্রকাশের বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় শব-ই-বরাত একটি বড় ধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

শব-ই-বরাত নিয়ে অনেক ধারণা প্রচলিত আছে । এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাওয়া-দাওয়া। তবে ইসলামি গবেষকরা মনে করেন এই দিন ও রাতকে হালুয়া-রুটি খাওয়ার রাতে পরিণত করে ইবাদত থেকে গাফেল হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তেমনি হালুয়া-রুটির ওপর ফতোয়া প্রদানও প্রজ্ঞাপ্রসূত নয়।