মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির বার্তা দিল ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের ছয়টি জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজার থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের শঙ্কা আপাতত কেটে গেল।
নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা
আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর বারিধারায় ইরান দূতাবাসে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের অবস্থান পরিষ্কার করতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান সব সময় ইতিবাচক। এরই ধারাবাহিকতায় তেহরান বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে। এই রুট দিয়ে বাংলাদেশের কোনো জাহাজ চলাচলে এখন আর কোনো বাধা নেই।”
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতাকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলের নৌপথগুলোতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের এই ঘোষণা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বর্ধিত মূল্যে জ্বালানি কেনা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের এই নমনীয় অবস্থান ঢাকা ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা উন্মোচন করল।
সংবাদ সম্মেলনের মূল পয়েন্টগুলো একনজরে:
অনুমতি: বাংলাদেশের মোট ৬টি বিশেষায়িত জ্বালানি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি প্রদান।
নিরাপত্তা: বাংলাদেশের পতাকাবাহী বা বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর জন্য এই পথে কোনো ঝুঁকি নেই বলে নিশ্চয়তা।
আয়োজক: ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের দূতাবাস, বুধবার দুপুর।
প্রেক্ষাপট: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা রক্ষা।
কূটনৈতিক সমীকরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা
সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরান কেবল জ্বালানি নয়, বরং কৃষি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে তেহরান নজর রাখছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশেষ অনুমতি কেবল একটি সাময়িক স্বস্তি নয়, বরং এটি বৈশ্বিক মেরুকরণে বাংলাদেশের গুরুত্বকেও তুলে ধরে। ইরান যখন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে, তখন বাংলাদেশের মতো একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশের সঙ্গে তাদের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশ অনেকাংশেই নির্ভরশীল। বিশেষ করে কাতার, কুয়েত বা সৌদি আরব থেকে জ্বালানি আসার পথে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হয়। তেহরানের এই গ্রিন সিগন্যাল বা সবুজ সংকেত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

