অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ট্রাম্পের ঘাঁটি



প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মার্কিন অর্থনীতিই ক্রমে মন্থর হয়ে পড়বে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব রিচমন্ড প্রকাশিত এক ওয়ার্কিং পেপারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
রিচমন্ড ফেডের তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের উষ্ণতম অঙ্গরাজ্যগুলোতে গ্রীষ্মকালে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস করবে। ফ্লোরিডা, লুইজিয়ানা, টেক্সাস, মিসিসিপি, ওকলাহামা, অ্যালাবামা, জর্জিয়া, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, আরকানসাস ও অ্যারিজোনার মতো গ্রীষ্মকালীন উষ্ণতম তাপমাত্রার অঙ্গরাজ্যগুলোর সবগুলোই দক্ষিণে অবস্থিত। আর ট্রাম্পের ঘাঁটি বলে পরিচিত এসব অঙ্গরাজ্যের ভোটের জোরে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন তিনি।
রিচমন্ড ফেডের ওয়ার্কিং পেপারটি ২০১৫ নেচার স্টাডির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের জন্য একটি অনূকূল তাপমাত্রার পরিসীমা সম্পর্কে বলা হয়েছে। দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৫৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে রয়েছে, সেসব অঞ্চলের অর্থনীতি উন্নত। যুক্তরাষ্ট্র জাপান ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশের মতো দেশগুলো একসময় এ আদর্শ তাপমাত্রার কাছাকাছি ছিল। কিন্তু অব্যাহত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এসব দেশের আবহাওয়া অনূকূল তাপমাত্রা থেকে সরিয়ে আনছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করছে। এখন প্রশ্ন হলো, জলবায়ু পরিবর্তন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা মন্থর করছে?
নতুন ওয়ার্কিং পেপারে বলা হয়েছে, যদি ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা যায়, তবে মার্কিন অর্থনীতি কেবল ৫ থেকে ১০ শতাংশ মন্থর হবে। হালনাগাদ বাস্তবায়িত জলবায়ু নীতিমালাসহ বর্তমান পথে (বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা ৩ থেকে ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে) চলতে থাকলে মার্কিন অর্থনীতি প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত মন্থর হয়ে পড়তে পারে। উচ্চতর কার্বন দূষণ পরিস্থিতিতে (যেখানে ২১০০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়াবে) কেবল উষ্ণতর তাপমাত্রার কারণেই মার্কিন অর্থনীতি প্রায় ১২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মন্থর হয়ে পড়বে।
মার্কিন অর্থনীতিকে মনোযোগে রেখে ওয়ার্কিং পেপারটি তৈরি করেছে ফেডারেল রিজার্ভ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলো। তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ বিষুব রেখার কাছাকাছি অবস্থিত, যেখানে তাপমাত্রা এরই মধ্যে ২০১৫ নেচার স্টাডির চিহ্নিত আদর্শ তাপমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। গত সপ্তাহে সায়েন্স অ্যাডভান্সে প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উষ্ণতর বিশ্বে এসব দরিদ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলো সবচেয়ে বড় তাপমাত্রা পরিবর্তন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাবে। তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার মতো স্বল্প সম্পদ এবং এর সঙ্গে পরিবর্তনশীল উচ্চ তাপমাত্রার কারণে এসব দরিদ্র দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধানতম নৈতিক দ্বন্দ্ব এটি। জলবায়ু পরিবর্তনে যেসব দেশের অবদান কম, সেসব দেশই সবচেয়ে বেশি পরিণাম ভোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে দরিদ্র দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তা থেকেও পিছিয়ে রয়েছে।
কার্বন কর বা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার অন্য কোনো প্রচেষ্টা ছাড়া তাপমাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মন্থর করবে। এ ভিত্তিমূলের পরিপ্রেক্ষিতেই জলবায়ু নীতিমালা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কার্বন কর যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করে, তবে কার্বন কর ছাড়া উষ্ণতর বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে নাকি কমবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বাকি বিশ্ব কোন পন্থা অবলম্বন করবে তার ওপর। বিশেষত কেবল যুক্তরাষ্ট্রই যেখানে বৈশ্বিক গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের ১৪ শতাংশের জন্য দায়ী।