বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর ইঙ্গিত দিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। এক নাটকীয় মোড় পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর ফলে সাগরে ভাসমান প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল খালাসের পথ উন্মুক্ত হওয়ায় ভারতসহ এশীয় দেশগুলো এখন আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সমুদ্রবক্ষে তেলের পাহাড়: কী বলছে উপাত্ত?
বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রসীমায় নোঙর করে থাকা বিশালাকার ট্যাঙ্কারগুলোতে এখন আটকা পড়ে আছে বিপুল পরিমাণ ইরানি অপরিশোধিত তেল। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ‘কেপলার’ (Kpler) জানিয়েছে, বর্তমানে গভীর সমুদ্রে জাহাজে প্রায় ১৭ কোটি (১৭০ মিলিয়ন) ব্যারেল ইরানি তেল রয়েছে।
তবে পরিসংখ্যান নিয়ে কিছুটা ভিন্নমতও রয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এনার্জি আসপেক্টস’ গত ১৯ মার্চ এক প্রাক্কলনে জানিয়েছিল, এই তেলের পরিমাণ হতে পারে ১৩ থেকে ১৪ কোটি ব্যারেল। পরিসংখ্যানের এই তারতম্য সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে প্রবেশ করলে তা বৈশ্বিক তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তন: এক মাসের বিশেষ ছাড়
শুক্রবার এক অভাবিত ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা এক মাসের জন্য ইরানি তেলের ওপর থেকে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখছে। এই পদক্ষেপকে ভূ-রাজনীতির ময়দানে এক বড় কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে এই তেল এতদিন আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারছিল না।
মার্কিন প্রশাসনের এই সবুজ সংকেতের পর বিশ্বব্যাপী তেল আমদানিকারকদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য এটি বড় এক স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে। এক মাসের এই ‘উইন্ডো’ বা সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বড় বড় আমদানিকারক দেশগুলো তাদের মজুদ পূর্ণ করতে তৎপর হয়ে উঠেছে।
এশীয় বাজারের প্রেক্ষাপট: ভারত ও চীনের নজর
ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় গ্রাহক হিসেবে পরিচিত এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত এই সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ। রয়টার্সের তথ্যমতে, ভারত ইতিমধ্যেই সাগরে ভাসমান এই তেল কেনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে শুরু করেছে।
এশীয় দেশগুলোর কাছে ইরানি তেলের আকর্ষণ বরাবরই বেশি। এর প্রধান কারণ হলো ভৌগোলিক নৈকট্য, যা পরিবহন খরচ কমিয়ে দেয়। এছাড়া ইরান প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আকর্ষণীয় ছাড়ে তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয়। ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে জ্বালানির আকাশচুম্বী চাহিদা মেটাতে এই সাশ্রয়ী তেল বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এক নজরে মূল তথ্যগুলো:
সাগরে ভাসমান মজুদ: কেপলারের মতে ১৭ কোটি ব্যারেল, এনার্জি আসপেক্টসের মতে ১৩-১৪ কোটি ব্যারেল।
মার্কিন সিদ্ধান্ত: ইরানের ওপর থেকে এক মাসের জন্য তেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
বাজার প্রভাব: বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা।
প্রধান আগ্রহী ক্রেতা: ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশসমূহ।
বাজার ও ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই এক মাসের ছাড় কেবল একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হতে পারে। যদি এই সময়ের মধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো সমঝোতা বা চুক্তির পথ প্রশস্ত হয়, তবে জ্বালানি বাজারে ইরানের স্থায়ী প্রত্যাবর্তন ঘটবে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ১৭ কোটি ব্যারেল তেল হঠাৎ বাজারে প্রবেশ করলে ওপেক (OPEC) প্লাস দেশগুলোর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগরের অস্থিরতার মাঝে এই বিপুল পরিমাণ তেলের সরবরাহ বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা হলেও ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করবে। তবে এক মাস পর যদি যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় কঠোর অবস্থানে ফিরে যায়, তবে বাজারের অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

