এ যেনো অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। এমন শূন্যতা কেউ দেখেনি আগে। পৌনে তিন’শ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঈদের দিনে নির্জনতা দেখালো উপ-মহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দান।
লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকার কথা ছিলো এ ময়দান। ঈদের দিন ভোর থেকে বিশালায়তনের এ ঈদগাহ ঘিরে চোখে পড়তো প্রশাসনের প্রস্তুতি যজ্ঞ। ঈদের আগের দিন থেকে দেশ- বিদেশের মুসল্লিদের মাঠে অবস্থা, রাত্রি-যাপন।
তবে এবারের ঈদে ইতিহাসের নতুন সাক্ষী হয়ে থাকলো শোলাকিয়া। মহামারি করোনা বদলে দিয়েছে ২৭০ বছরের ইতিহাস। এই প্রথম বারের মতো নির্জনতা নিয়ে একটি ঈদের সকাল পার করলো শোলাকিয়া। করোনা মহামারি বদলে দিয়েছে শোলাকিয়ার শত শত বছরের ঐতিহ্য।
যুগের পর যুগ নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাক কেটেছে। তবে বন্ধ হয়নি শোলাকিয়া মাঠের ঈদের জামাত। এমনকি জামায়াত শুরুর আগে ইতিহাসের বর্বরোচিত জঙ্গি হামলার সময়েও হয়েছে ঈদের জামাত। একদিকে পুলিশের সাথে জঙ্গিদের বন্দুকযুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঈদের নামাজ।
তবে এইসব সব ইতিহাস। বাস্তবতা হচ্ছে, বৈশ্বিক করোনা মহামারির জন্য এবারই প্রথম শোলাকিয়া মাঠে ঈদের জামাত হয়নি। ঈদের ঘিরে ঈদগাহ ময়দান ও আশপাশে ছিলো না সংস্কার আর শোভার্বধনের চাকচিক্য। বরং নিরানন্দ আর মলিনতা নিয়েই একটি ঈদুল ফিতর পার করলো শোলাকিয়া।
বিশাল এ প্রান্তরের সবুজ ঘাসে যেনো বেদনার অশ্রুর মতোই জমে ছিলো ভোরের জলকণা। আর শোলাকিয়া। জামাত না হওয়ায় কিশোরগঞ্জ যেনো এক অচেনা-অজানা এক জনপদ।
সাধারণত ঈদের দিন ভোর থেকে সারা শহর থাকতো হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর গাড়ি বহরের ইর্মাজেন্সি হুইসেল, ট্রাফিক পুলিশের ঘাম ঝরা অবস্থান আর দেশ-বিদেশের সংবাদকর্মীদের কর্মব্যস্ততা ছিলো ঈদের সকালের চিরচেনা দৃশ্য। শোলাকিয়া ঈদগাহে এবার ছিলো ১৯৩তম ঈদুল ফিতরের বড় জামায়াত।
১৯২ বছর আগে শুরু শোলাকিয়ায় ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এরও দুইশ বছর আগে থেকে এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতি বছর শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠানে নেয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরে দেশ-বিদেশের তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ মুসল্লি একসঙ্গে শোলাকিয়ার বিশাল প্রান্তের নামাজ পড়েন। এখানে একটি মাত্র জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
বিশাল প্রান্তের সব মুসল্লি যাতে নামাজ শুরুর মুহূর্তটি জানতে পারেন এ জন্য নামাজ শুরুর আগে বেশ কয়েকবার বন্দুকের গুলি ছোঁড়া হয়। সব শেষ জামাত শুরুর এক মিনিট আগে গুলি ছুঁড়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতি ঘোষণা করা হয়।
লাখো মুসল্লির নিরাপত্তায় নেয়া হয় চার স্তরের নিরাপত্তা। সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশসহ বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন থাকে মাঠের চারপাশে। জামাত ঘিরে পুরো শহর যানবাহন শূন্য করে সাজানো হয় ট্রাফিক ব্যবস্থা।
আকাশে নজরদারি করে উন্নত ক্যামেরা যুক্ত ড্রোন। দূরের মুসল্লিদের জন্য ময়মনসিংহ ও ভৈরব বাজার থেকে চলাচল করে দু’টি বিশেষ ট্রেন সার্ভিস।
তবে এবার সব আয়োজন থামিয়ে দেয় অদৃশ্য করোনাভাইরাস। বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপশালী বীর ঈশা খাঁর ১৬তম বংশধর দেওয়ান মান্নান দাঁদ খান ১৯৫০ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহটি ওয়াকফ্ করেন। তারও দুইশ বছর আগে থেকে শোলাকিয়া মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বলে উল্লেখ আছে ওই ওয়াকফ দলিলে।
১৮২৮ সালে ঈদুল ফিতরের বড় জামাতে এ মাঠে প্রথম ১ লাখ ২৫ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়ালাখিয়া’, যা এখন শোলাকিয়া নামে পরিচিতি।
২০১৬ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে পুলিশের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়। দুই পুলিশ সদস্যসহ নিহত হন বেশ কয়েকজন। তবু থেমে থাকেনি ঈদের জামাত। তবে এই প্রথমবারের মতো ঈদের দিনেও নীরব থাকছে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া।

