আজ ৬ আগস্ট। হিরোশিমা দিবসের ৭৫তম বার্ষিকী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা তখন জোরেশোরে বাজছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষার্ধে ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট স্থানীয় সময় ৮টা ১৫মিনিটে আমেরিকান বিমান বাহিনী হিরোশিমা নগরীতে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটায় আমেরিকা। যার মাধ্যমে ঘটেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়।
হিরোশিমা জাপানের একটি নগর। এটি হিরোশিমা প্রশাসনিক অঞ্চলের রাজধানী এবং জাপানের মূল দ্বীপ হোনশুর চুউগোকু অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নগর।
জাপানের হিরোশিমা শহরে স্থানীয় সময় তখন সকাল আটটা ১৫ মিনিট। আগেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। মার্কিন বি-টুয়েন্টি নাইন বোমারু বিমান এনোলা গে থেকে হিরোশিমায় ফেলা হয় আণবিক বোমা ‘লিটল বয়’। বোমাটি প্রায় ৫০০ মিটার উঁচুতে বিস্ফোরিত হয়।
অনুমান করা হয় যে ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক মারা যান। জাপানের আসাহি শিমবুন-এর করা হিসাব অনুযায়ী বোমার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগসমূহের ওপর হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য গণনায় ধরে হিরোশিমায় ২৩৭,০০০ লোক মারা যায়।
সেই দিনের বিভীষিকার কথা তখনকার মানুষেরাতো বটেই, বর্তমান যুগের মানুষেরা, এমনকি ভবিষ্যতের মানুষেরা পর্যন্ত ভুলতে পারবে না। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। খুব অল্প সংখ্যকই বেঁচে আছে। তেমনি একজন বলেছেন সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা।
ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘প্রথমে মনে হল, আকাশ থেকে যেন একটা কালো প্যারাস্যুট নেমে আসছে। পরমুহূর্তেই আকাশ যেন জ্বলে উঠল। আলোর সেই ঝিলিক যে কী রকম তা বলার সাধ্য কারও নেই। সেই সঙ্গে প্রচন্ড শব্দ। বিস্ফোরণের পরমুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলো শতশত ভবন ও হাজার হাজার মানুষ। সেই সঙ্গে আশপাশের জিনিসপত্র এদিক ওদিক পড়ে জমা হতে থাকল। চারিদিকে আলো ও অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। হামাগুড়ি দিয়ে বেরোতে হল, কালো ঘোর অন্ধকারে।
বাতাসে বীভৎস গন্ধ। মানুষের মুখের চামড়া যেন ঝুলে পড়েছে। কনুই থেকে আঙুল অবধি হাতের চামড়া ঝুলে পড়ছে। কাতরাতে কাতরাতে ঝর্ণা আর নদীর দিকে ছুটে চলেছে অসংখ্য মানুষ। সারা দেহে অসহ্য জ্বালা। চারিদিকে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ পড়ে আছে। মৃতের শরীরে জামা-কাপড় প্রায় কিছুই নেই। গায়ের কাপড়গুলো জ্বলে গেছে। নদীর তীরের কাছে একজন নারী আকাশের দিকে মুখ করে পড়ে আছে। বুক দুটো তার উপড়ানো, সেখান থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
ঘণ্টা দুয়েক পর আকাশ একটু ফিকে হয়ে গেল। ঝলসে যাওয়া হাত দুটো থেকে হলুদ কষ গড়ে পড়ছে। স্কুলের মেয়েরা কাতরাচ্ছে আর চিৎকার দিয়ে কাঁদছে মাগো মাগো বলে। ভয়ংকরভাবে পুড়ে গেছে তারা, সারা শরীরে রক্ত গড়াচ্ছে কাতরভাবে মাকে ডাকতে ডাকতে একে একে দেহগুলো নিথর হয়ে যাচ্ছে।’

পারমানবিক বোমা হামলা সাথে সাথেই যে শুধু মানুষ পুড়ে মারা গেছে তা কিন্তু নয় বোমার তেজস্ক্রিয়া, শরীরের নানাহ অংশ পুড়ে যাওয়া, মারাত্মক ভাবে আহত হওয়া, ক্যান্সার, অন্ধত্ব, পঙ্গুত্ববরনসহ নানাহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিভর্ষ মানুষের স্মৃতি। বোমার হামলার ভয়াবহতার জের মানবজাতিকে টানতে হয়েছে বছরের পর বছর।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, যুগের পর যুগ আমেরিকার এই বর্বরতাকে মানতে পারেনি, পারবেনা। এই দিনটিকে হিরোশিমা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

