ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাতের মেঘে যখন বিশ্ব অর্থনীতির আকাশ অন্ধকার, ঠিক তখনই স্বস্তির খবর দিচ্ছে দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। মধ্যপ্রাচ্যের রণসজ্জায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও মার্চের প্রথম ২২ দিনে বন্দরে ২৫টি জাহাজ থেকে সফলভাবে জ্বালানি খালাস সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির দাবার চালে জ্বালানি তেলের বাজার যখন টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো স্থবিরতা নেই। রবিবার (২২ মার্চ) বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে চলছে। বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী জাহাজ আসা এবং পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রয়েছে।
সংঘাতের ছায়া বনাম বন্দরের তৎপরতা
মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরের অস্থিরতা সাধারণত এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি আমদানিতে বড় প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়ার উল্লম্ফন বা বীমা ঝুঁকির কারণে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, চলতি মাসে এ পর্যন্ত ২৫টি বড় জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস খালাস করা হয়েছে। বর্তমানে ওমান থেকে আসা একটি বড় জাহাজ থেকে এলপিজি (LPG) খালাস করার কাজ চলছে। এছাড়া থাইল্যান্ড থেকে ‘বেস অয়েল’ নিয়ে আসা আরেকটি জাহাজ বহির্নোঙরে অপেক্ষায় রয়েছে, যা দ্রুতই খালাস শুরু করবে।
বন্দরের এই নিরবচ্ছিন্ন সেবা কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদার স্থিতিশীলতা রক্ষায় বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটে অনেক দেশ যখন মজুত নিয়ে সংকটে পড়ছে, তখন বাংলাদেশের এই ধারাবাহিকতা আমদানিকারকদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
আগামীর পথে শক্তিশালী বহর
বন্দর সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সাগরে অস্থিরতা থাকলেও বাংলাদেশের পথে আরও জাহাজ আসার প্রক্রিয়া থেমে নেই। বর্তমানে ‘বিক বরনহলম’ এবং ‘মর্নিং জেন’ নামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। এগুলো বন্দরে পৌঁছালে দেশের জ্বালানি মজুত আরও শক্তিশালী হবে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখলেও বর্তমান সময় পর্যন্ত পণ্য সরবরাহে কোনো বড় ধাক্কা লাগেনি।
“আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কোনো নেতিবাচক প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরের জ্বালানি খালাস কার্যক্রমে পড়েনি। আমাদের অপারেশনাল টিম চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করছে।” — সৈয়দ রেফায়েত হামিম, সচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
একনজরে চট্টগ্রাম বন্দরের জ্বালানি চিত্র (১–২২ মার্চ):
মোট খালাসকৃত জাহাজ: ২৫টি (জ্বালানি তেল ও গ্যাস)।
বর্তমান কার্যক্রম: ওমান থেকে আসা জাহাজে এলপিজি খালাস চলছে।
অপেক্ষমাণ জাহাজ: থাইল্যান্ডের বেস অয়েলবাহী জাহাজ (বহির্নোঙর)।
পথিমধ্যে থাকা জাহাজ: ‘বিক বরনহলম’ ও ‘মর্নিং জেন’।
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: যুদ্ধকালীন ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে বিশেষ সতর্কতা।
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
যদিও ২২ মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক, তবে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের রুট পরিবর্তনের সম্ভাবনা থেকে যায়। এতে পরিবহন খরচ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের এই স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে হলে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথও খোলা রাখতে হবে।

