বলতে গেলে সারাবিশ্বেই থাবা বসিয়েছে করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসের বাহ্যিক প্রভাব শুধু মানুষের শরীরে হলেও এর কারণেই নড়বড়ে হয়ে গেছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এই ভাইরাসের কড়াল গ্রাস মুক্তি দেয়নি আমাদের মনোজগতকেও। যা ভবিষ্যতেও প্রভাব ফেলতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে।
বর্তমানে রেডিও, টেলিভিশন জুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবর রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও নানারকম তথ্য, উপাত্ত, পরামর্শ, গুজব ইত্যাদি ছড়িয়ে রয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা বৃদ্ধির নানা খবরে মানসিক উদ্বেগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে, স্বাভাবিকভাবেই যার প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। সংক্রামক এই ভাইরাস নিয়ে অব্যাহত ভীতির কারণে মানুষের চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক মেলামেশা, বিচার ক্ষমতা আরও বেশি রক্ষণশীল হয়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানীর মতে, অভিবাসন, যৌন স্বাধীনতা ও সমতা নিয়ে মানুষের ভাবনায় পরিবর্তন আসতে পারে। এমনকি আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শেও পরিবর্তন ঘটাতে পারে করোনাভাইরাস।
বৈশ্বিক মহামারিটি ছড়িয়ে পড়ার পরই অনেক দেশেই হামলার শিকার হয়েছেন এশিয়ার অভিবাসীরা। স্পষ্টতই প্রমানীত যে, করোনাভাইরাসের ফলে এর মধ্যেই অহেতুক ভীতি এবং বর্ণবিদ্বেষের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে।
এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব টরোন্টোর ইয়োয়েল আনবান বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারী আমাদের চিন্তাভাবনার জগতে কী ধরণের পরিবর্তন আনছে, তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত নেই। কিন্তু আচরণগত প্রতিরোধ ব্যবস্থার যে থিওরি রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, সারা বিশ্বের জনসংখ্যার বিবেচনা করলে এটা হয়তো মাঝারি ধরণের পরিবর্তন হবে। সামাজিক চিন্তাভাবনায় বিশাল কোন পরিবর্তন আসবে না।
তিনি দেখতে পেয়েছেন, ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারীর সময় সামাজিক বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। দুই লাখ মানুষের ওপর চালানো একটি জরিপে দেখা গেছে, সমকামীদের ব্যাপারে মানুষের মনোভাব নেতিবাচক হয়ে উঠেছিল।
স্বাভাবিক নিয়মে যা কিছুই আমাদের শরীরের জন্য খারাপ হতে পারে, সেটা আমরা এড়িয়ে যেতে চাই, তার বিরুদ্ধে এক ধরণের প্রতিরোধমূলক আচরণ তৈরি করি। যেমন যেসব খাবারের গন্ধ খারাপ, আমরা ধরে নেই সেগুলো অপরিচ্ছন্ন। আমরা সম্ভাব্য সংক্রমণ থেকে অবচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে চাই। অনেক সময় পচা কোন খাবার খেয়ে ফেলার পর আমাদের প্রাথমিক আচরণ হয় বমি-বমি ভাব আসা। যার মাধ্যমে শরীরের ভেতর সংক্রমিত হওয়ার আগেই আমরা সেই বিষাক্ত জিনিসটিকে বের করে দিতে চাই।
এ বিষয়ে ভ্যাঙ্কুভারের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার অধ্যাপক মার্ক স্কলার বলছেন, “এটা অনেকটা মেডিকেল ইনস্যুরেন্সের মতো। এটা থাকা ভালো, কিন্তু যখন আপনি সেটা ব্যবহার করা শুরু করবেন, তখন দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব জিনিস আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়েছে, সেগুলো আমাদের মনের ভেতরে থেকে যায়। ফলে এ ধরণের কোন পরিস্থিতি তৈরি হলে, যা আমাদের ভবিষ্যতে বিপদে ফেলতে পারে, সেগুলো আমরা এড়িয়ে যাই। মানুষ যেহেতু সামাজিক জীব, অনেকের সঙ্গে একত্রে মিলেমিশে থাকতে অভ্যস্ত, তাই রোগের বিস্তার ঠেকাতে তখন মানুষের সাথে চলাফেরা, মেলামেশার ধরণের ওপরেও পরিবর্তন আসে। ফলে রোগের সংক্রমণ এড়াতে মানুষ সামাজিক দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করে।
আর্থাউস ইউনিভার্সিটি অব ডেনমার্কের অধ্যাপক লেনে অ্যারোয়ি বলছেন, অনেক সময় এ ধরণের আচরণ ভুল হতে পারে, হয়তো ভুল তথ্যের ভিত্তিতে হতে পারে, হয়তো আমাদের নীতিগত অবস্থান বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করেও হতে পারে।
এমনকি এই মহামারি শেষ হলেও স্থায়ীভাবে মানুষ নতুন করে বন্ধু তৈরি করতে বা নতুন কারো সাথে পরিচিত হতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে।
মার্ক স্কলারের মতে, অসাদৃশ্য বা সামঞ্জস্যহীনতার প্রতি আমাদের ভীতির কারণে এটা ঘটতে পারে, যা অতীতের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে আমাদের ভেতরে এসেছে। তখন সংক্রামক রোগের সময় মানুষ নিজেদের গ্রুপ বা গোত্রের বাইরের মানুষকে এড়িয়ে চলতো। ধারণা করা হতো তাদের কাছ থেকে হয়তো রোগ আসতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে একে কুসংস্কার এবং জেনোফোবিয়া ছাড়া আর কিছু বলা যাবে না।
লেখক অ্যারোয়ি যেমন দেখতে পেয়েছেন, সংক্রামক রোগের ভীতির কারণে অভিবাসন নিয়ে অনেক মানুষের মনোভাব বদলে গেছে।
তিনি মনে করেন, মানুষের ভেতরে যে আচরণগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে, যার কারণে মানুষ মনে করে যে, ‘দুঃখিত হওয়ার চেয়ে নিরাপদ হওয়া জরুরি’ সে কারণেই তারা এরকম আচরণ করতে পারে।

