রেমিট্যান্সের জোয়ারে চাঙা অর্থনীতি: ১৬ দিনেই আসলো ১৮০ কোটি ডলার


রেমিট্যান্সের জোয়ারে চাঙা অর্থনীতি: ১৬ দিনেই আসলো ১৮০ কোটি ডলার

দেশের অর্থনীতিতে সুবাতাস বইছে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের হাত ধরে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ১৬ দিনেই দেশে এসেছে ১৮০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২১ শতাংশ বেশি। এই উল্লম্ফনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫৩ বিলিয়ন ডলারে।

রেমিট্যান্সের নতুন রেকর্ড ও বাজারের গতিপ্রকৃতি

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসার প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাসের মাত্র দুই সপ্তাহেই প্রবাসী আয়ের এই বিশাল অঙ্ক দেশের ডলার সংকটে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করতে নানা উদ্যোগ নেওয়ায় এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

সাধারণত দেখা যায়, দুই ঈদের আগে রেমিট্যান্স বাড়ে। তবে কোনো উৎসব ছাড়াই বছরের এই সময়ে ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়াকে অর্থনীতির জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। গত বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৬ দিনে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল এর চেয়ে অনেক কম। এবারের এই উল্লম্ফন প্রমাণ করছে যে, হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলের ওপর প্রবাসীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।

রিজার্ভে শক্তিশালী অবস্থান

প্রবাসী আয়ের এই জোয়ার সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। ডলারের সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক মাস ধরে যে রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করেছিল, তার সুফল এখন দৃশ্যমান। প্রবাসী আয় বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার উদ্বৃত্ত থাকছে, আর সেই সুযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে নিজেদের মজুত শক্তিশালী করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত কয়েক মাসের মধ্যে এটি অন্যতম সর্বোচ্চ অবস্থান। রিজার্ভের এই শক্ত অবস্থান আমদানিকারকদের এলসি (LC) খোলার ক্ষেত্রে বাধা দূর করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ক্রেডিট রেটিং বাড়াতে সহায়তা করবে।

এক নজরে মূল পরিসংখ্যান

নিচে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হলো:

  • মোট রেমিট্যান্স (ফেব্রুয়ারি ১-১৬): ১৮০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

  • প্রবৃদ্ধির হার: গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১% বৃদ্ধি।

  • বর্তমান রিজার্ভ: ৩৪.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

  • মূল চালিকাশক্তি: বৈধ চ্যানেলে ডলারের প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার।

নীতিমালার প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স বাড়ার পেছনে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার বা ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতির কিছুটা প্রভাব রয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন ডলার কেনা-বেচায় আগের চেয়ে বেশি নমনীয়তা দেখাচ্ছে। এছাড়া সরকারের দেওয়া নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক বাড়তি প্রিমিয়াম দিচ্ছে, যা প্রবাসীদের উৎসাহিত করছে।

তবে এই ধারা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি আয় বাড়ানোর দিকেও সমান নজর দিতে হবে। প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা যদি আগামী কয়েক মাস স্থায়ী হয়, তবে দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখা অনেক সহজ হবে।

ডলারের অস্থিরতার মধ্যে রেমিট্যান্সের এই বিশাল উল্লম্ফন দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করছে। রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান আমদানির দায় মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারকে আরও সাহসী পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে।

এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে কতটুকু সফল হয়। তবে বর্তমান চিত্র বলছে, বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার আবারও স্বরূপে ফিরতে শুরু করেছে।