শৈশবের নায়করা এভাবেই বিদায় নেয়!


paperslife

এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। যুবরাজ সিংয়ের সাথে কথাটা খুব বেশি মানায়। আর তাইতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পা দেওয়ার সাথে সাথে নিজের জাত চেনাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ভারতের এই ক্রিকেট সম্রাট।

হার মানেন নি, হারিয়ে যাননি। লড়াই করেছেন প্রতিনিয়ত। খেলার মাঠে, জীবনের সাথে এ লড়াইয়ে জিতেছেন বীরের বেশে। সেই বীরত্ব দেখিয়ে সবকিছু জয় করা যুবরাজ সিং এবার বলছেন বিদায়।

ক্রিকেট থেকে বিদায় নিচ্ছেন বড্ড অভিমানে। ভারতের বিশ্বকাপ জয়ী দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকে এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান এমন সময় বিদায় নিচ্ছেন, যখন তার দল বিশ্বকাপ খেলছে। অথচ সে দলে তার জায়গা এক আর হয় না।

ভারতের হয়ে শেষ ওয়ানডে খেলেছেন দুই বছর আগে, টি-টোয়েন্টিও তা-ই। সাদা পোশাকে শেষবার মাঠে নেমেছিলেন তারও পাঁচ বছর আগে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে যেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘গুডবাই’ হয়েই গিয়েছিল। তার আনুষ্ঠিকতাটুকু সারলেন মুম্বাইতে।

তার বিদায়ে আরো একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল বিশ্ব ক্রিকেটে। ধন্যবাদ যুবরাজ সিং।

২০০০ সালে কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত আইসিসি নকআউট টুর্নামেন্টে (বর্তমানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় যুবরাজ সিংয়ের।

ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮০ বলে ৮৪ রানের এক ইনিংস খেলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন নিজের মূল্য। সেই অস্ট্রেলিয়া ছিল ম্যাকগ্রা, ওয়ার্নদের অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বল হাতে কতটা কার্যকর সেদিনই বুঝিয়েছিলেন।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি যুবরাজকে। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে ভারের বিখ্যাত ফাইনাল জয়ের মূল নায়ক ছিলেন তিনি তার ৬৯ রানের উপর বড় করেই সেদিন লর্ডসে জেতে ভারত। সৌরভ গাঙ্গুলির জার্সি খুলে ঘুরানোর উপলক্ষ্য এনে দিয়েছিলেন সেদিন, এই যুবরাজ সিং।

২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কিংবা ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ে যুবরাজ লড়াই করেছেন, সামনে থেকে। ২০১১ সালে ঘরের মাঠে মূলত যুবরাজের কাঁধে চড়েই  ২৮ বছরের বিশ্বকাপ-খরা কাটায় ভারত। পুরো টুর্নামেন্টে করেছিলেন ৪টি হাফ সেঞ্চুরি ও একটি সেঞ্চুরি। মত রান ৩৬২। বল হাতেও ছিলেন এক লড়াকু সৈনিক। ১৫ জন ব্যাটসম্যানকে দেখান প্যাভিলিয়নের পথ। টুর্নামেন্টে চারবার ম্যাচসেরা হন। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন তিনি।

২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছিলেন অনবদ্য। স্টুয়ার্ট ব্রডকে এক ওভারে ৬ ছক্কা মেরে নাম লিখিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়। সেমিফাইনালের সে লড়াইয়ে তাঁর ১২ বলে ৫০ রানের ইনিংসটি ছিল ভারতের ফাইনালে যাওয়ার প্রথম বীজ। এরপর পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা ঘরে রে ভারত।

ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও টেস্টে অবশ্য খুব সফল ছিলেন না তিনি। ২০০৩ সালে টেস্ট অভিষেক হলেও ৪০টির বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি এই ক্রিকেট সম্রাট।

ক্রিকেটকে ছাপিয়ে জীবন সংগ্রামে বারবার লড়াই করতে দেখা গেছে যুবরাজ সিংকে। ২০১১ সালে ক্যানসার ধরা পড়েছিল তার। জীবন সংগ্রামে সপে দিয়েছিলেন নিজেকে। লড়েছেন তিনটি বছর। তবে হার মানেননি ক্যানসারকে পরাজিত করে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার মাঠে ফিরেছেন। গল্প লিখেছেন বিজয়ের।

২০১৭ সালে ফিরেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ারসেরা ১৫০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মাত্র ১২৭ বলে। তার ব্যাট যেন জীবন যুদ্ধেরই গল্প শোনায়।

নিজের বিদায়ের ঘোষণা দিতে মুম্বাইতে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন তিনি। মুম্বাইয়ের এক হোটেলে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে বেশ আবেগপ্রবণ ছিলেন,

আমি বলব আমি যথেষ্টই সৌভাগ্যবান, ভারতের হয়ে চার শরও বেশি ম্যাচ খেলতে পেরেছি। পেছনে ফিরে তাকালে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের ফাইনালে, লাহোরে আমার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০১১ বিশ্বকাপ, ২০০৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ, সেই ছয় ছক্কা— এগুলোই আমার ক্যারিয়ারের হাইলাইট হয়ে থাকবে। ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে (ঢাকায়) শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২১ বলে ১১ করেছিলাম। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জঘন্য দিন ছিল সেটা। মনে হচ্ছিল, আমার ক্যারিয়ারই শেষ!

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও খেলবেন রঞ্জি ট্রফি, জানিয়েছেন যুবরাজ সিং। এছাড়াও আইপিএলেও খেলবেন এই তারকা ক্রিকেটার।

জীবন যুদ্ধে জিতেছেন, জিতেছেন খেলার মাঠে। সব শেষে তিনি হেরেছেন, বুঝেছেন এই ভারতীয় দলে এখন আর তার জায়গা নেই। এবার যে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। তবে চাইলেই কি ছেড়ে যাওয়া যায়? কখনো কখনো যায় না। কেউ কেউ তার অবদানের জন্য মনে থাকবে, মনে রাখবে বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের অসংখ্য ভক্তরা।